দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এবার এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়ের সূচনা হলো। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতা—দুজনেই প্রথমবারের মতো নির্বাচিত সংসদ সদস্য।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
তারেক রহমান বা শফিকুর রহমান—কেউই আগে সংসদ সদস্য ছিলেন না। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাঁদের মতোই নির্বাচিত এমপিদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি এবার প্রথমবারের মতো সংসদে বসতে যাচ্ছেন।
ত্রয়োদশ সংসদে মোট ২৯৭ জন সদস্যের মধ্যে অন্তত ২০৯ জনই (৭০ শতাংশ) প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। অর্থাৎ সংসদ কার্যত নবীনদের হাতেই শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়।
বিএনপি ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছে। এর মধ্যে ১৩২ জনই নতুন মুখ, যা দলটির সংসদীয় দলের ৬৩ শতাংশ।
জামায়াতে ইসলামীতে নতুন মুখের হার আরও বেশি। দলটির ৬৮ জন সাংসদের মধ্যে ৫৯ জনই (৮৬ শতাংশ) প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছেন।
ছোট দলগুলোর ক্ষেত্রে চিত্র আরও স্পষ্ট। ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) ছয়জনই প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, গণঅধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের ছয়জন প্রতিনিধির সবাই নতুন। সাতজন স্বতন্ত্র সাংসদের মধ্যে ছয়জনও প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল তারেক রহমানের প্রথম অংশগ্রহণ। তিনি বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭—এই দুই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুটিতেই জয়ী হন।
ডা. শফিকুর রহমান ২০০১ ও ২০১৮ সালে মৌলভীবাজার-২ আসনে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে জামায়াতের নিবন্ধন না থাকায় তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ঢাকা-১৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরেছিলেন। এবার তিনি ঢাকা-১৫ থেকেই জয়ী হয়েছেন।
জোনায়েদ সাকি ২০১৮ সালে ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মনোনয়নে হেরে যান। এবার বিএনপির সমর্থনে নিজ দলের প্রতীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন।
গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক (নুর) বিএনপির সমর্থনে পটুয়াখালী-৩ আসনে প্রথমবার নির্বাচন করে জয় পেয়েছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সম্মুখসারির নেতা নাহিদ ইসলাম প্রথমবার নির্বাচন করেই ঢাকা-১১ আসনে জয়ী হয়েছেন। এনসিপির আরও পাঁচজন নেতাও প্রথমবারের ভোটেই জয়ী হয়েছেন। তারা সবাই জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের অংশ ছিলেন।
সংসদীয় বিষয়াবলি–সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞ নিজাম আহমেদ এই পরিস্থিতিকে ‘নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন না। বিরোধী বেঞ্চে মাত্র সাতজন এমপি ছিলেন, যাদের ‘বিরোধী গ্রুপ’ বলা হতো।
সংসদীয় রেকর্ড অনুযায়ী, শেখ হাসিনা পাঁচবার সংসদ নেতা ছিলেন—সপ্তম সংসদে প্রথম এবং নবম থেকে দ্বাদশ সংসদ পর্যন্ত টানা চার মেয়াদে। তিনি ১৯৮৬ সালে প্রথম এমপি হন।
খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে প্রথম এমপি নির্বাচিত হন এবং তিনবার সংসদ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন—পঞ্চম, ষষ্ঠ ও অষ্টম সংসদে।
বিভিন্ন সময়ে কাজী জাফর আহমদ, মওদুদ আহমদ, মিজানুর রহমান চৌধুরী, শাহ আজিজুর রহমান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মনসুর আলী সংসদ নেতা ছিলেন।
বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন জি এম কাদের, রওশন এরশাদ, খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা, আ স ম আবদুর রব ও আসাদুজ্জামান খানসহ অনেকে।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের ধারায় এবারই প্রথম এমন বাস্তবতা তৈরি হলো, যেখানে উভয় পক্ষের নেতৃত্বই সংসদে একেবারে নতুন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম আহমেদ মনে করেন, নতুনদের শুরুতে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি মেনে চলতে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তাঁর ভাষায়, তাঁদের ‘লার্নিং বাই ডুয়িং’ নীতি অনুসরণ করতে হবে।
তবে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এস কে তৌফিক এম হক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, নতুনরা সংসদ কার্যকরভাবে চালাতে পারবেন না—এমন ধারণা সঠিক নয়। অতীতের রেকর্ড বলছে, অভিজ্ঞ রাজনীতিকেরাই অনেক সময় সংসদকে অকার্যকর করেছেন।
তিনি বলেন, ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত অভিজ্ঞ নেতারাই দায়িত্বে ছিলেন, কিন্তু সংসদকে পুরোপুরি কার্যকর করতে পারেননি। ফলে শুধু নবীনদের অভিজ্ঞতার ঘাটতিকে দায়ী করা যায় না।
তাঁর মতে, নতুন মুখের আগমন পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল নেতৃত্বে পরিবর্তন। মানুষ পুরোনো নেতৃত্বের পরিবর্তন চেয়েছিল এবং নতুন মুখ দেখতে চেয়েছিল—এই নির্বাচনের ফলাফল তারই প্রতিফলন।
ত্রয়োদশ সংসদ তাই শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব নয়, বরং এটি নেতৃত্ব ও প্রজন্ম পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত। যদি নতুনরা সংসদীয় সংস্কৃতি, বিতর্ক ও সংলাপের চর্চা জোরদার করতে পারেন, তবে রাজনৈতিক দাবি-দাওয়ার জন্য রাজপথের বদলে সংসদই হয়ে উঠতে পারে মূল মঞ্চ।
এই সংসদ কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—এবারের সংসদে পরিবর্তনের বার্তা স্পষ্ট।

