মঙ্গলবার বিকেলে নতুন মন্ত্রিপরিষদের শপথের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে দেড় বছরের বেশি সময়ের অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায়। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে টানা সাড়ে ১৬ বছরেরও বেশি সময়ের প্রধানমন্ত্রীশাসিত পর্বেরও অবসান ঘটে।
স্বাধীনতার পর থেকে দেশে একাধিকবার শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। কখনো রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতি ছিল, কখনো সংসদীয় সরকারব্যবস্থা, আবার কখনো সামরিক আইন প্রশাসকের নেতৃত্বেও দেশ পরিচালিত হয়েছে। নির্বাচনকালীন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তিনবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। একবার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বেও দেশ চলেছে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে মহান স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর গ্রেপ্তার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার অনুপস্থিতিতে ওই বছরের ১০ এপ্রিল গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধু। মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত সেই সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় সৈয়দ নজরুল ইসলামকে। ১৭ এপ্রিল সরকার শপথ নেয়।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফেরেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়েন এবং সেদিনই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ওই দিনই আবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন।
১৫ আগস্টই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তিনি ৬ নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। ৩ নভেম্বর ও ৬ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের পর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন।
কিছুদিন পর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন জিয়াউর রহমান। রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন তিনি। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। ১৯৮১ সালের ৩০ মে আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
|
|---|
তার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে ছিলেন। ওই দিন ক্ষমতা দখল করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ছিলেন। পরে সেনাপ্রধানের পদ ছেড়ে একই দিনে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি গঠন করেন জাতীয় পার্টি। ওই বছর নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার পতন হয়।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এরশাদের পতনের পর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ। ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে ছিলেন।
১৯৯১ সালের ২০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন খালেদা জিয়া। এ সময় রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতির পরিবর্তে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়। পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন আয়োজন করে তার সরকার। আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি দল সেই নির্বাচন বর্জন করে। জয়ী হয়ে দ্বিতীয়বার দায়িত্ব নিলেও আন্দোলনের মুখে সংবিধান সংশোধন করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমানএর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন খালেদা জিয়া।
হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে সপ্তম সংসদ নির্বাচন শেষে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। মেয়াদ শেষে ২০০১ সালের ১৫ জুলাই তিনি ক্ষমতা দেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে। প্রধান ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান। অষ্টম সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়ে ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর আবার প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া।
২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি ক্ষমতা দেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদএর হাতে। পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালের ১২ জানুয়ারি দায়িত্ব নেন সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদ। প্রায় দুই বছর পর নবম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আবার প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলে ১২ জানুয়ারি তৃতীয়বারের মতো দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। পরে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনেও তার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।
|
|---|
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনার সরকার। ৮ আগস্ট গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এর নেতৃত্বে আসেন মোহাম্মদ ইউনূস।
দেড় বছরের বেশি সময় পর সেই অন্তর্বর্তী অধ্যায়েরও অবসান ঘটছে নতুন মন্ত্রিপরিষদের শপথের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার দীর্ঘ ইতিহাসে যোগ হচ্ছে আরেকটি নতুন অধ্যায়।

