বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখন সুবিধাবাদ আর ক্ষমতার সমীকরণ মূল নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন হাবিব-উন-নবী খান সোহেল এক ব্যতিক্রমী চরিত্র।
ত্যাগ, নিবেদন এবং রাজপথের অদম্য সাহসের যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা আধুনিক রাজনীতির ইতিহাসে বিরল। কিন্তু বিনিময়ে দল বা রাষ্ট্র তাকে কী দিল—সেই প্রশ্ন এখন সাধারণ নেতাকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মুখে মুখে।
ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত রাজনৈতিক জীবন
সোহেলের রাজনীতি ড্রয়িংরুমের বিলাসিতা নয়, বরং পিচঢালা রাজপথের ঘাম আর রক্তে ভেজা। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১/১১-এর সেনাশাসিত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—প্রতিটি সন্ধিক্ষণে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। ৫ জানুয়ারি বা ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি ছিলেন নেতাকর্মীদের প্রধান ভরসাস্থল।
-
বিনিময়হীন লড়াই: তার রাজনীতি ছিল আত্মপ্রচারবিমুখ। ভোগবাদী রাজনীতির বিপরীতে তিনি বেছে নিয়েছিলেন কণ্টকাকীর্ণ পথ।
-
পারিবারিক বিসর্জন: সংসারের সুখ, সন্তানদের সান্নিধ্য কিংবা ব্যক্তিগত আরাম—সবই বিসর্জন দিয়েছেন দলের জন্য। যখনই সুযোগ পেয়েছেন, পরিবার তাকে পেয়েছে রাবার বুলেটে বিদ্ধ অবস্থায় বা কারাগারের লোহার শিকের ওপাশে। দীর্ঘ ১৭ বছর গুম ও খুনের শঙ্কা নিয়ে কখনো পালিয়ে, কখনো রাজপথে, কখনোবা জেলে কাটিয়েছেন তিনি।
মামলার রেকর্ড ও রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র
৬১৮টি মামলা! এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং একজন মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এক বিভীষিকাময় দলিল। পৃথিবীর খুব কম দেশেই একজন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে এত বিপুল সংখ্যক মামলার নজির পাওয়া যায়। সোহেলের রাজনৈতিক জীবন কেবল রাজপথের লড়াই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধের নাম। জাপানি নাগরিক হোসি কুনিও হত্যার মতো স্পর্শকাতর মামলায় তাকে জড়িয়ে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ বানানোর চেষ্টা কিংবা রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে রাজনীতি থেকে মুছে ফেলার নীল নকশা—প্রতিটি পদক্ষেপ তিনি লড়াই করে মোকাবিলা করেছেন।
- রিমান্ড ও জেল: মাসের পর মাস রিমান্ডের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন তাকে দমাতে পারেনি। এক জেল থেকে অন্য জেলে স্থানান্তরিত হওয়ার সময়ও তার চোখেমুখে ছিল আগামীর স্বপ্ন। রিমান্ডের সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠেও তার ইস্পাতকঠিন মানসিকতা ছিল অবিচল।
- অসুস্থতায়ও অবিচল: করোনা আক্রান্ত হয়ে যখন ফুসফুস লড়ছিল মৃত্যুর সাথে, আর শরীরে ছিল পুরনো বুলেটের ক্ষত—সেই অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে আদালতে হাজিরা দেওয়া তার অদম্য মনোবলেরই প্রমাণ।
কারাবরণের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ও বীরত্বগাথা
গত ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির এক টার্নিং পয়েন্ট। একদিকে হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে গ্রেপ্তারের সাজানো ‘নাটক’, অন্যদিকে প্রশাসনের জ্যামার ও কড়া পাহারা—সবই ছিল তাকে নেত্রীর কাছ থেকে দূরে রাখার অপকৌশল। কিন্তু সব ব্যারিকেড ভেঙে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মহাখালীর জটলা আর পুলিশের বেষ্টনী ভেদ করে তিনি যখন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন, তখন তা কেবল একটি মিছিল ছিল না, তা ছিল নেত্রীর প্রতি এক সেনাপতির অবিচল আনুগত্যের প্রমাণ। নিজের পা গাড়ির চাকার নিচে পিষ্ট হওয়ার যন্ত্রণা নিয়েও তিনি যেভাবে ব্যারিকেড ভেঙেছিলেন, তা আজও নেতাকর্মীদের মনে এক অবিস্মরণীয় বীরত্বগাথা হয়ে আছে।
জনগণের কাছে সোহেলের জনপ্রিয়তা এখনও আকাশচুম্বী। বিশেষ করে তরুণ ভোটার এবং দীর্ঘদিনের নির্যাতিত কর্মীদের কাছে তিনি হলেন আশার আলো। তার সাংগঠনিক দক্ষতা এবং মিষ্টভাষী ও বিনয়ী আচরণের কারণে তিনি কেবল নিজের দলেই নয়, বরং দলমতের ঊর্ধ্বে অনেকের কাছেই শ্রদ্ধার পাত্র। নেতাকর্মীদের সাথে তার সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এক আত্মিক ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন।
মূল্যায়নের প্রশ্নে রাজনীতির নির্মম পরিহাস
প্রতিবেদনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায় হলো—তার বর্তমান অবস্থান। রাজনীতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো যখন ত্যাগের মূল্যায়ন হয় না। দুঃসময়ের কাণ্ডারিকে ত্রয়োদশ নির্বাচন ঘিরে যখন ‘উপেক্ষা’ করা হলো, তখন তা কেবল সোহেলকেই বিদ্ধস্ত করেনি, বরং আদর্শিক রাজনীতির ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই সেই “সোহেল”—যিনি কোর্টের বারান্দায় পা টলতে থাকা সেই বিদ্ধস্ত সোহেল যখন সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে শুধু বলেছিলেন ‘নো কমেন্টস’, সেই নীরবতা ছিল হাজারো আর্তনাদের চেয়েও শক্তিশালী।
“অন্ধকার খাদের কিনারায় দাঁড়িয়েও যিনি আশার আলো দেখেন, আজ তার নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কেন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে?”
৬১৮টি মামলার বোঝা কাঁধে নিয়ে যখন একজন নেতা অবহেলিত হন, তখন তা কেবল ব্যক্তির অপমান নয়, বরং রাজপথের সংগ্রামী রাজনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে যে, সবচেয়ে বেশি ত্যাগী মানুষটিই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত।
পরিশেষে, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল পদের প্রত্যাশী ছিলেন কি না, তা তার বিনয় দেখলেই বোঝা যায়। তিনি সবসময় বলেছেন, “দল যা দেবে তা-ই মাথা পেতে নেব।” কিন্তু দলের উচিত ছিল তার ত্যাগের মর্যাদা দেওয়া। সুবিধাবাদী সিন্ডিকেট রাজনীতির ভিড়ে সোহেলরা হারিয়ে গেলে রাজপথের রাজনীতি নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়বে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, পদ-পদবি না থাকলেও মানুষের হৃদয়ে যারা জায়গা করে নেন, তারাই প্রকৃত বিজয়ী। হাবিব-উন-নবী খান সোহেল সেই বিজয়ী বীরের নাম।

