বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব এবার দৃশ্যমান হচ্ছে সুদূর যুক্তরাজ্যে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের বিশাল বিজয় এবং প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
এই পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী কয়েক হাজার বাংলাদেশি এবং তাদের পরিবার এখন তীব্র আইনি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের মূল ভিত্তি হলো নিজ দেশে রাজনৈতিক কারণে ‘সুনির্দিষ্ট নিপীড়নের ভয়’। গত দেড় দশকে বহু বাংলাদেশি যুক্তরাজ্যে আশ্রয় চেয়ে দাবি করেছিলেন, বিএনপি বা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় তারা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পড়েছেন।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এবং জামায়াত প্রধান বিরোধী দল। ফলে ব্রিটিশ হোম অফিস এখন এসব আবেদন নতুন করে কঠোরভাবে পর্যালোচনা শুরু করেছে। প্রশ্ন উঠেছে—যখন দাবিকৃত ‘নিপীড়নকারী’ পক্ষ আর ক্ষমতায় নেই, তখন কি আশ্রয়ের ভিত্তি বহাল থাকে?
যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন রুলস-এর ৩৩৯এ ধারা অনুযায়ী, যদি নিজ দেশের পরিস্থিতিতে এমন মৌলিক ও স্থায়ী পরিবর্তন ঘটে যার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আর সুরক্ষার প্রয়োজন নেই, তাহলে হোম অফিস তার ‘রিফিউজি স্ট্যাটাস’ বাতিল করতে পারে।
একইভাবে, ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ১সি (৫) বলছে—যে পরিস্থিতির কারণে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল, তার অবসান ঘটলে শরণার্থী মর্যাদাও আর বহাল থাকে না।
লন্ডনের প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার সালাহ উদ্দিন সুমনের ভাষ্য, “যখন আপনার দলের শীর্ষ নেতা দেশের প্রধানমন্ত্রী হন, তখন আপনি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হতে পারেন—এই দাবি আদালতে টিকিয়ে রাখা কঠিন।”
তিনি মনে করেন, যাদের আবেদন এখনো ঝুলে আছে, তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে।
হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ সালেও যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদনকারী শীর্ষ পাঁচটি দেশের তালিকায় ছিল বাংলাদেশ।
২০২৪ সালে মোট ৭ হাজার ২২৫ জন বাংলাদেশি রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন।
তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্রিটিশ সরকার একটি ব্যাপক বিতাড়ন কর্মসূচি শুরু করতে পারে—এমন আশঙ্কাও জোরালো হচ্ছে।
শুধু যুক্তরাজ্য নয়, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিতেও একই ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৪ সালের মে মাসে যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেটি দ্রুত কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাজ্য বিএনপির আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রকৃত নির্যাতিত নেতাকর্মীদের সহযোগিতা করা হয়েছিল। তবে এখন পেন্ডিং আবেদনগুলোর বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্ত তাদের নিজস্ব বিষয়।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ইউরোপের মুখপাত্র ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা দাবি করেছেন, প্রতিটি আশ্রয় আবেদন স্বতন্ত্র ভিত্তিতে বিবেচিত হওয়া উচিত। তার মতে, আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে ক্ষমতায় না থাকলেও জামায়াত নেতাকর্মীরা এখনও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আরেকটি দিকও সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের সাবেক কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপিসহ শতাধিক নেতাকর্মী যুক্তরাজ্যে আশ্রয় চেয়েছেন। তাদের অনেকের আবেদন ইতোমধ্যে হোম অফিস মঞ্জুর করেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন কেবল ঢাকার রাজপথে সীমাবদ্ধ থাকেনি—তা এখন লন্ডনের আদালত কক্ষেও আলোচিত বিষয়।
যারা রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগে আশ্রয় চেয়েছিলেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই নির্ভর করবে প্রতিটি মামলার স্বতন্ত্র প্রমাণ ও আইনি বিশ্লেষণের ওপর। তবে একথা স্পষ্ট—বাংলাদেশের রাজনীতির পালাবদল আন্তর্জাতিক অভিবাসন আইনের অঙ্গনেও নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে।

