বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অলি আহাদ একটি উজ্জ্বল নাম। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সাহসী সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় কর্মী এবং নীতিনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি আজও স্মরণীয়। তাঁর জীবনসংগ্রাম, আদর্শ ও দেশপ্রেম জাতির ইতিহাসে গভীরভাবে অঙ্কিত।
তিনি ১৯২৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবদুল ওহাব ছিলেন শিক্ষিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। ছাত্রজীবনেই রাজনীতির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি ঢাকা কলেজে পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এ ভর্তি হন। তবে ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। দীর্ঘ ৫৮ বছর পর ২০০৬ সালে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অভিযোগে তিনি গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘ সময় কারাবরণ করেন। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তাঁর এই আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে গৌরবময় অধ্যায়।
জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতি
অলি আহাদ রাজনীতি করেছেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি ও শেখ মুজিবুর রহমান–এর মতো নেতাদের সঙ্গে। ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেন।
তিনি আওয়ামী লীগ–এর সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে নীতিগত প্রশ্নে আপস না করে পরে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হন। পরবর্তীতে তিনি ডেমোক্রেটিক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক হয়।

মুক্তিযুদ্ধ ও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধেও তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ়। এরশাদ আমলে তিনি একাধিকবার গ্রেফতার হন এবং তাঁর সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার রক্ষায় তাঁর সংগ্রাম ছিল অবিচল।
তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়। তাঁর রচিত গ্রন্থ “জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-১৯৭৫” বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
পরিবার ও উত্তরাধিকার
অলি আহাদের স্ত্রী ছিলেন প্রফেসর রশিদা বেগম। তাঁদের একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, যিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য। ২০২২ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাবার মৃত্যুতে তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতার মুখোমুখি হন।
দীর্ঘ বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার পর ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি হয়।
অলি আহাদের জীবন আমাদের শেখায়—আদর্শের প্রশ্নে আপস নয়, ন্যায় ও নীতির পক্ষে দৃঢ় অবস্থানই একজন প্রকৃত নেতার পরিচয়।

