জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসক) কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন মূল্যায়ন করবে। বাংলাদেশে নবনির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বুধবারই প্রথম কার্যদিবসে জাতিসংঘের ওই কমিটির কাছে এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন পাঠায়। তবে এর আগে দেড় বছর দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তী সরকার সিডিপিকে জানায়, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের উত্তরণ কার্যকর হওয়ার জন্য প্রস্তুতি সম্পূর্ণ।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সিডিপির বার্ষিক প্লেনারি সভা আগামী সোমবার শুরু হবে। ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কমিটির সভা চলবে। সভার একটি সেশনে বাংলাদেশের আবেদন বিশেষভাবে আলোচনা হবে। আলোচনাটি হবে এনহান্সড মনিটরিং মেকানিজম (ইএমএম) ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে। এ ফ্রেমওয়ার্কের প্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সিডিপির সদস্য। বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য তিনি শনিবার ঢাকাগামী বিমান ধরেছেন।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সমকালকে জানান, ইএমএম ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় দুটি বিষয় আলোচনার বিষয়বস্তু। প্রথম, যারা ইতিমধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণ করেছে, তাদের স্থিতিশীলতার পর্যালোচনা। দ্বিতীয়, এলডিসি উত্তরণের পাইপলাইনে থাকা দেশগুলো। এই অংশে বাংলাদেশের আবেদন বিশেষভাবে আলোচনা হবে। চিঠিটি দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিবের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে।
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি সংক্রান্ত ‘বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপোর্ট ২০২৫’ একই সচিব পাঠিয়েছিলেন। রিপোর্টে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ সঠিক পথে আছে। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নভেম্বর মাসে পাঠানো হয়। ফলে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়েই এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে। তবে বর্তমান সরকার মন্ত্রী পরিষদে সিদ্ধান্ত নিয়ে উত্তরণ পেছানোর আবেদন করেছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। বিষয়গুলো বোঝা হবে বৈঠকে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ‘ক্রাইসিস বাটন’ ক্লিক করেছে। অর্থাৎ দেশের পক্ষ থেকে সংকটে পড়লে এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানো সম্ভব। সংকটের ক্ষেত্রে দেখাতে হবে, অভাবিত এবং নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত ঘটনা ঘটেছে কি না। এর আগে সোলোমন আইল্যান্ডে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল। সেদেশে সুনামি ও সামাজিক সংঘাতের কারণে উত্তরণ পেছানো হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংকটগুলো কী রকম, তা মূল্যায়ন করা হবে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সিডিপির বৈঠকে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত আসবে না। বাংলাদেশ কীভাবে এই আবেদন মূল্যায়ন করা হবে, তার পদ্ধতি ঠিক করা হবে। এতে সরকারের পূর্বের কৌশলপত্র, সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত এবং অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হবে। সাম্প্রতিক তথ্যের সঙ্গে সরকারের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হবে।
তিনি জানান, বৈঠকে আলোচনার মূল বিষয় হবে, নভেম্বর মাসে সরকারের দেওয়া রিপোর্টের পরে হঠাৎ কেন পরিবর্তন হলো এবং অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা কী বলে। নেপাল ও লাওস এখন পর্যন্ত কোনো আবেদন করেনি। তাদের বিষয়ে মূল্যায়নের পদ্ধতি বৈঠকে নির্ধারিত হবে। এছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের জাতিসংঘের হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিস ওএইচআরএলএসের প্রতিনিধি রিপোর্টও বিবেচনায় আনা হবে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বুধবার ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী সিডিপি চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে চিঠি পাঠান। চিঠিতে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের উত্তরণ-প্রস্তুতির সময় ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন করা হয়।
এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সাংবাদিকদের জানান, নতুন সরকার এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দিতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। ইআরডির সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করে উত্তরণ পেছানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
চলতি বছরের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ নির্ধারিত। ২০১৮ ও ২০২১ সালের সিডিপির ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে বাংলাদেশ তিনটি সূচক উত্তীর্ণ হয়—মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। ২০২১ সালে সিডিপি সুপারিশ করে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে। তবে করোনার অতিমারির কারণে উত্তরণ দুই বছর পেছানো হয়।
ব্যবসায়ী মহল দীর্ঘদিন ধরে আরও অন্তত তিন বছর সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। গত আগস্টে ১৬টি ব্যবসায়ী সংগঠন সংবাদ সম্মেলন করে ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০৩২ সালে উত্তরণের প্রক্রিয়া নেওয়ার দাবি জানায়। তাদের আশঙ্কা, সুবিধা শেষ হলে তৈরি পোশাক ও ওষুধ শিল্প চাপের মুখে পড়তে পারে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার সময় বাড়ানোর আবেদন করেনি।
ইআরডি সচিবের চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতির স্বীকৃতি এবং কভিড-১৯ অতিমারির প্রভাব থেকে পুনরুদ্ধারে সহায়তার জন্য মোট পাঁচ বছর সময় প্রদানে কৃতজ্ঞতা জানায় বাংলাদেশ। তবে এই সময়ে একের পর এক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংকটে উত্তরণের প্রস্তুতি ব্যাহত হয়েছে। বৈশ্বিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপট অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ উত্তরণের তিনটি মানদণ্ড পূরণ করেছে। কিন্তু কভিডের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ধীরগতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও তার প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্য বাজার অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগরে সংঘাত এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা দেশের প্রস্তুতিতে বাধা দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে আর্থিক খাতে অনিয়ম, গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিষ্পন্ন থাকা এবং জাতীয় বাজেট থেকে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দের বিষয়গুলোও চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করেছে।
কান্ট্রি রিপোর্টে যা বলা হয়েছিল:
গত ১০ নভেম্বর ইআরডি ‘বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপোর্ট ২০২৫’ পাঠায়। রিপোর্টে উল্লেখ থাকে, কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের পথে সঠিক অবস্থায় রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অগ্রগতি ব্যতিক্রম। সহিংস ঘটনা বা সরকারের পতন ঘটে এমন দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতির অবস্থা থেকে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

