লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ২০২৫ সালের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম।
বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার পেছনে শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক এবং লিবিয়ার ত্রিপোলি রয়েছে। একই সময়ে বায়ুদূষণের সূচকেও বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরগুলোর মধ্যে উঠে এসেছে ঢাকা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী দল বিএনপি ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে। ওই দিনও বিশ্বের ১২১টি শহরের মধ্যে বায়ুদূষণে ঢাকা দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। বাতাসের মান ছিল ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’। তবে এটি শুধুমাত্র ওই দিনের ঘটনা নয়; বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা। ঢাকার পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারও ব্যর্থ হয়েছে। বায়ুদূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকট, জলাবদ্ধতা এবং সবুজায়নের অভাব মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় গত দেড় বছরে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বায়ুমান বছরের অধিকাংশ সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে থাকে। খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো, নির্মাণ কাজের ধুলা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, জলাশয় ভরাট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। নগর পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতাকে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
দেশের নদী-খাল দখল, বন উজাড় এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব উপেক্ষা করার ফল এখন স্পষ্ট। বায়ুদূষণের কারণে অকালমৃত্যু, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে; উৎপাদনশীলতা কমছে; স্বাস্থ্যব্যয় বাড়ছে। পরিবেশ এবং বাসযোগ্যতার ভঙ্গুর বাস্তবতার মধ্যে নতুন সরকারকে দায়িত্ব নিতে হয়েছে। তবে দক্ষতার পরিচয় না দিলে দেশের পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিএনপি সরকারের সামনে পরিবেশ নিয়ে দুইটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন অধ্যাপক ড. এএসএম সাইফুল্লাহ। একদিকে সারা দেশের পরিবেশগত সংকট মোকাবেলা, অন্যদিকে ঢাকার বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এ অধ্যাপকের মতে, পুরো দেশই বর্তমানে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন। এমন বাস্তবতায় নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঢাকাকে আবার বাসযোগ্য নগরীতে রূপ দেওয়া।
ঢাকা ধীরে ধীরে অবাসযোগ্য নগরীতে পরিণত হচ্ছে উল্লেখ করে ড. সাইফুল্লাহ বলেন, ‘রাজধানীর দূষণ এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি অর্থনৈতিক সমস্যা। জ্যাম এবং ধুলায় ভরা শহর বিনিয়োগবান্ধব হতে পারে না। বায়ুদূষণের কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ অসুস্থ হচ্ছে এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহনের জন্য আলাদা সড়ক নির্ধারণ করলে বায়ুদূষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।’
বিশ্বের ১৮০ দেশের পরিবেশের অবস্থা নিয়ে ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭২তম। এতে বায়ুমান, বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ স্যানিটেশন, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং কার্বন নিঃসরণের মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল ল অ্যান্ড পলিসি, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল আর্থ সায়েন্স ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (সিআইইএসআইএন) এবং ম্যাকল মেক বেইল ফাউন্ডেশন যৌথ উদ্যোগে এটি প্রকাশ করে। ইনডেক্সে পরিবেশ স্কোর ধরা হয় ১০০, যেখানে বাংলাদেশ পায় মাত্র ১৫।
ফিনল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বায়ুদূষণের কারণে যাদের মৃত্যু হয়, তাদের ৪৮ শতাংশ ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দা। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইটের তথ্য, আন্তর্জাতিক তথ্যভাণ্ডার এবং সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য ব্যবহার করে এ গবেষণা করা হয়।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুতে অতি ক্ষুদ্র কণা বা পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি রোধ করা গেলে বছরে ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জনের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। পাঁচ বছরের নিচের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। দূষণ কমালে বছরে ৫ হাজার ২৫৪ শিশুর জীবন রক্ষা সম্ভব। এছাড়া হৃদরোগে ২৯ হাজার ৯২০, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে ২৩ হাজার ৭৫, সিওপিডিতে ২০ হাজার ৯৭৬, নিউমোনিয়ায় ৯ হাজার ৭২০ এবং ফুসফুসের ক্যান্সারে ৩ হাজার ৬৩ জনের মৃত্যু রোধ করা সম্ভব। বায়ুদূষণের কারণে স্বাস্থ্যসেবার খরচ বাড়ছে, উৎপাদনশীলতা কমছে এবং বহু কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশের পরিবেশ সবচেয়ে অবহেলিত ছিল। বড় প্রকল্প মানেই পরিবেশের ওপর আঘাত। খুলনার কয়রায় রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে ক্ষতি করেছে। পদ্মা সেতুর নির্মাণ প্রমত্ত পদ্মাকে বালুচরে পরিণত করেছে। ঢাকা থেকে কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণে হাতিসহ বন্যপ্রাণীর আশ্রয় নষ্ট হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং নদী রক্ষা কমিশনের নীরবতার কারণে নদ-নদী, খাল-বিলের অনেক অংশ শুকিয়ে গেছে বা ধ্বংস হয়েছে। ঢাকার মতো মেগা শহরে সরকারি আবাসন, অফিস, সড়ক নির্মাণের নামে খাল, জলাশয় এবং ঐতিহ্যবাহী মাঠও ভরাট হয়েছে। ফলে ঢাকার বাসযোগ্যতা এখন তলানির দিকে।
পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতা পায় অন্তর্বর্তী সরকার। দেড় বছরে পরিবেশ সূচকে আরও অবনতি হয়েছে। বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, মাটিদূষণ—মৌলিক বিষয়গুলোতে কোনো অগ্রগতি দেখানো যায়নি। পরিবেশকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আগের ক্ষয় আরও বেড়েছে। নদী ও খালের দখল বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, ‘সরকারের কাছে বড় সমস্যা হলো পরিবেশ, নদী, বন—এগুলোকে তারা বিলাসী ধারণা হিসেবে দেখে। এ দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। নদীকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, পর্যটন, মৎস্য উৎস হিসেবে দেখতে হবে। এখন বড় নদীতে মাছ নেই, পানি দূষিত, পর্যটন নেই। আমরা দূর থেকে পানি আনি, বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে মাছ চাষ করি, দেশের পর্যটন চলে যায়। নদীকে ভুলভাবে দেখার ফলেই এই অবস্থা।’
নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা নতুন সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে। সরকারি উদ্যোগে নদী পুনরুজ্জীবন ও রক্ষা সম্ভব।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে পরিবেশ ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। প্রায় এক দশক ধরে ঢাকার বায়ুদূষণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুক্রবার ছুটির দিনেও সকাল সাড়ে ৯টায় বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের সূচকে ঢাকার অবস্থান বিশ্বের দূষিত শহরের শীর্ষে। আকাশ প্রায় মেঘাচ্ছন্নের মতো। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, শীতে বায়ুদূষণের কারণে এমন ধোঁয়াশা তৈরি হয়। শুধু ঢাকা নয়, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রাজশাহী এবং রংপুরেও বায়ুদূষণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুতই বায়ুদূষণ দেশের প্রধান সমস্যা হয়ে উঠবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘মাটি, পানি, বায়ু—সবই দূষিত। এতে কৃষি ও মৎস্য সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। মানুষের শরীরে ঢুকছে বিষ, ক্যান্সারসহ বড় অসুখের কারণ হচ্ছে। সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। সুন্দরবনের জন্যও আলাদা পরিকল্পনা প্রয়োজন। সুন্দরবন শুধু সম্পদ নয়, রক্ষাকবচ। বড় দুর্যোগে এটি সবসময় রক্ষা করেছে।’
জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ড. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘জলবায়ু প্রভাব কৃষি, মৎস্য, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে নিচে নামাচ্ছে। কিছু রফতানি করি, কিন্তু বায়ুদূষণের কারণে চিকিৎসায় টাকা খরচ করি। অসময়ে বৃষ্টি ফসল নষ্ট করে। নতুন সরকারকে জলবায়ু বিষয় নিয়ে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।’
ঢাকাসহ দেশের বড় অংশ ভূমিধস, ভূমিকম্প এবং অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকিতেও রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ভূগর্ভস্থ পানি হ্রাস, নদী-খাল ব্যবহার অনুপযোগী—এসব সমস্যা নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা বন দখল, বন্যপ্রাণী হত্যা, পাচার, নাব্য সংকট ও নদীপথ বন্ধ হওয়াও নিয়মিতভাবে মোকাবেলার পরামর্শ দেন।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকার বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য গণপরিবহন ও গণপরিসরের ওপর নজর দিতে হবে। মানসম্মত গণপরিবহন না থাকায় মানুষ ভুগছে। পার্ক ও মাঠ কম। বিদ্যমান পার্ক-মাঠ দখলমুক্ত করে নতুন তৈরি করতে হবে। ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। ঢাকার বাইরে সেবা ও অবকাঠামো ছড়িয়ে বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি। ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতি থেকে ৫০ শতাংশ উন্নতি আনলেই তা নতুন সরকারের জন্য বড় অর্জন হবে।’
বিএনপির নির্বাচনী ইশতাহারে ঢাকায় ২০টি মাঠ পুনরুদ্ধার, খাল খনন এবং বৃক্ষরোপণের কথা বলা হলেও পরিবেশ বিপর্যয়ের স্পষ্ট গাইডলাইন নেই। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, ‘দেশের পরিবেশ খুব খারাপ। বায়ুদূষণ মানুষের আয়ু কমাচ্ছে। শব্দদূষণ মারাত্মক। নদী-খাল দূষিত। দূষণ কমানো অপরিহার্য। আমরা ১৮০ দিনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। কয়েক দিনের মধ্যে সঠিক গাইডলাইন জানাতে পারব।’

