ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই বছর পরে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় ছিল। পুলিশের কিছু কর্মকর্তা সেই সময়ে ক্ষমতাশীল ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তাদের প্রভাব কম ছিল না। নতুন সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের সুবিধা ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়েছেন।
বিএনপি সরকার গঠনের পর নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে কাজ শুরু করেন। এ অবস্থায় পুলিশের একটি সূত্র জানায়, যেসব কর্মকর্তা সব সরকারের আমলে সুবিধা ভোগ করেছেন, তাদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার গোপন বার্তা এসেছে হাইকমান্ড থেকে। বার্তা পেয়ে দুটি ইউনিটসহ গোয়েন্দারা কাজ শুরু করেছেন।
এই অনুসন্ধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন অতিরিক্ত আইজিপি, ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টরসহ দেড় শতাধিক কর্মকর্তা। তাদের বিশদ তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তালিকা তৈরি করে গভীর তদন্তও শুরু করেছে একাধিক সংস্থা। তালিকাভুক্ত কর্মকর্তারা সব সরকারের আমলে বিশেষ সুবিধা নিয়ে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করেছেন। নতুন সরকার আসার পর তারা বিএনপি আদর্শের আখ্যা দিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। গোয়েন্দা তদন্তে ইতিমধ্যে এমন তথ্য উঠে এসেছে যে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও অনেক কর্মকর্তা সুবিধা নিয়েছেন।
সুবিধাভোগী ও বঞ্চিত কর্মকর্তা:
পুলিশের অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক কর্মকর্তা বঞ্চিত ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও তাদের উপেক্ষা করা হয়েছিল। তারা দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের পরও সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা পদোন্নতি ও সব ধরনের সুবিধা নিয়েছেন। কিন্তু অনেকের মধ্যে হতাশা বেড়েছে। অতিরিক্ত আইজিপি, উপপুলিশ মহাপরিদর্শকসহ বিভিন্ন পদ খালি থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি হচ্ছেনা।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত অনেকে আত্মগোপনে ছিলেন। ঢাকা মহানগরসহ পুলিশের সব ইউনিটে কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যন্ত বদলি করা হয়েছে। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও ভালো স্থানে পদায়ন করা হয়েছে। তবু সহস্রাধিক পুলিশ সদস্য এখনও বঞ্চিত। অভিযোগ আছে, অনেক পদ খালি থাকলেও ঊর্ধ্বতনরা নজর দিচ্ছেন না।
ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগবিরোধী হয়েছেন অনেকে:
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, পলাতক কর্মকর্তাদের আস্থাভাজনরা সুবিধা পাচ্ছেন। অনেকেই ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগবিরোধী হয়েছেন। কেউ সফল হয়েছেন, কেউ ব্যর্থ। কেউ কেউ অর্থ খরচ করে ভালো স্থানে পোস্টিং নিয়েছেন। তবে যারা পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছেন, তারা সব সরকারের আমলে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, নতুন সরকার আসার পর অনেকেই বিএনপি সেজে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সরকারের হাইকমান্ড ইতোমধ্যে সুবিধাভোগী পুলিশ ও অন্যান্য সদস্যের বিষয়ে খোঁজ নিতে নির্দেশ দিয়েছে। কাজও শুরু হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিভিন্ন স্থানে মামলার আসামি হওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে কিছু পেশাদারও রয়েছেন। তারা গত সরকারের সময় ভালো অবস্থানে ছিলেন এবং অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনবিরোধীও ছিলেন না। কিন্তু কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এমনকী কিছু কর্মকর্তা সিনিয়রদের গায়ে হাত তুলেছেন। মামলার নাম দ্রুত বাদ দিলে পুলিশ লাভবান হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারেও রাজনৈতিক সুবিধা:
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় দুইশোর বেশি পুলিশ কর্মকর্তা আত্মগোপনে ছিলেন। কিন্তু তাদের আস্থাভাজনরা বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভিযোগ আছে, সেখানে থেকে তারা বিভিন্ন অনিয়ম করছেন। কিছু কর্মকর্তা তথ্য পাচারেও জড়িত। বদলি-বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। আবার কিছু সৎ কর্মকর্তা আসামি হয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও কিছু কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক ছিল। তারা ১৮ মাস একটি দলের হয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার ও ডিএমপির কর্মকর্তাদের তথ্য উঠে এসেছে। তালিকায় যাদের নাম আছে, তারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদোন্নতি ও দলীয় সুবিধা ভোগ করেছেন। ৫ আগস্টের পর তারা দ্রুত ভোল পাল্টে অন্য দলের পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন। বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়েছেন।
সুবিধাভোগী কর্মকর্তারাই এখন বিএনপি সমর্থক:
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের সব সরকারের আমলে সুবিধা ভোগ করা অন্তত ১৫০ কর্মকর্তাকে সরাসরি একটি দলপন্থি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা ১৮ মাস নানা সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন।
এদের মধ্যে গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী, নোয়াখালী, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, বগুড়া, পাবনা, নাটোর, জয়পুরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, নড়াইল, মেহেরপুর, বরিশাল, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, রংপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার পুলিশ সুপারদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নরসিংদী, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, ফেনী, খাগড়াছড়ি, সিরাজগঞ্জ, খুলনা, নওগাঁ, কুষ্টিয়া, মাগুরা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, জামালপুর, শেরপুর, ঠাকুরগাঁও ও কুড়িগ্রামের পুলিশ সুপার বিএনপি মতাদর্শী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।
বদলি ও পদায়নে সরকারের নজর:
ডিএমপি ও পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা ১৬ বছর কঠোর পরিশ্রম করেছেন। কোনো প্রমোশন বা পোস্টিং পাননি। ৫ আগস্টের পর ভালো পদ আশা করেছিলেন। কিন্তু এখনও বিএনপিপন্থিরা সেই পোস্টিংয়ে রয়েছেন। তারা জোর লবিং করছেন নিজেদের পদ ধরে রাখার জন্য।
মনোবল না ফিরিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা:
পুলিশে ৩ হাজার ১৪৬টি ক্যাডার পদ রয়েছে। একজন আইজিপি, দুজন অতিরিক্ত আইজিপি (গ্রেড-১), ২০ জন অতিরিক্ত আইজিপি (গ্রেড-২), ৮৭ জন ডিআইজি (গ্রেড-৩), ২০১ জন অতিরিক্ত ডিআইজি (গ্রেড-৪), ৫৯৬ জন এসপি (গ্রেড-৫), ১ হাজার ৮ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গ্রেড-৬), ১ হাজার ২৩১ জন এএসপি (গ্রেড-৯)।
অনেককেই আগে ভালো স্থানে চাকরি দেওয়া হয়েছিল। এখন তারা অবহেলিত বোধ করছেন। নতুন সরকার তাদের আরও ভালো স্থানে নিয়োগ দেবেন। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় অতিরিক্ত বল প্রয়োগ ও হামলা-হত্যার শিকার হওয়ার কারণে পুলিশ মনোবল এখনও ফেরেনি। কেউ কেউ এই সুযোগে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
কমিশন গঠনের দাবি ফলপ্রসূ হয়নি:
মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, তারা মনোবল হারিয়েছেন। দায়িত্ব দেশের নাগরিক ও সম্পদ রক্ষা করা হলেও রক্ষার নিশ্চয়তা নেই। বিএনপি সরকার গঠন করে পুলিশকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ সংস্কারে কমিশন গঠন করেছিল। রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা বারবার কমিশনকে বলেছেন, রাজনৈতিক বেড়াজাল থেকে পুলিশকে বের করতে হবে। তবেই জনগণ সেবা পাবে। কিন্তু আশানুরূপ কিছু হয়নি।
নির্বাচনের আগে ও পরে বাণিজ্য:
পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন হয়েছিল। তখন পুলিশ ব্যাপকভাবে বেপরোয়া ছিল। মাঠের কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতনের কথা মানতেন না। নির্বাচন আগে ও পরে গ্রেপ্তার বাণিজ্য হয়েছিল। গায়েবি মামলায় বিএনপি-জামায়াতের লোক গ্রেপ্তার হয়ে পুলিশ অনেকে বাণিজ্য করেছিলেন। পটপরিবর্তনের পর একই ধারা চালু ছিল। ত্রয়োদশ নির্বাচনে পুলিশ কিছুটা ভালো করেছে। এরপরও কিছু কর্মকর্তা সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। প্রতিরোধ না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

