ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেক ও চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের অভিযানকে ঘিরে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে প্রশ্ন উঠছে, পুলিশের শক্তি প্রয়োগ কি অতিরিক্ত ছিল।
ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় দুইজন সাংবাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং পথচারীদের মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে কিছু ব্যক্তিকে হাতকড়া পরিয়ে আটক করতেও দেখা গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, তারা কোনো অবৈধ কাজ করেনি। তারপরও পুলিশ তাদের মারধর করেছে। পুলিশের দাবি, অভিযান চলাকালীন কাজের বাধা সৃষ্টি করার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ডিএমপি রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম বলছেন, মারধরের ঘটনাটি ‘ভুল বোঝাবুঝি’ থেকে হয়েছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনার পাশাপাশি ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় পুলিশের অভিযানে তরুণ ও কিশোরদের আটক নিয়েও তর্ক-বিতর্ক চলছে। পুলিশের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে অপরদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ছিনতাই ও মাদক ব্যবহার কমাতে এর প্রয়োজনীয়তাও কেউ কেউ স্বীকার করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, তা পুনরায় সামনে এসেছে। তারা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পুলিশ পদক্ষেপ নিতে পারে, কিন্তু সবসময় আইনের মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনায় চারজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করে অভিযানের সময় আইনের ব্যত্যয় ঘটলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনার বিস্তারিত:
দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদকবিরোধী অভিযান হলেও ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত। অভিযানের সময় দুইজন মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং পথচারীরা মারধরের শিকার হয়েছেন।
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে, কয়েকজনকে পুলিশ তর্কে জড়াতে গিয়ে লাঠিচার্জ করেছে। এক ভিডিওতে দুইজনকে হাতকড়া পরিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে একজনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিতে দেখা যায়।
ভিডিওতে একজন পুলিশ সদস্য বলেন, অভিযানের সময় এক মাদকাসক্ত ব্যক্তি পুলিশকে আক্রমণ করলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়। এতে একজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
অন্য ভিডিওতে দেখা যায়, রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম একজনকে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে এক পুলিশ সদস্য তাকে পেছন থেকে টেনে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে মারতে শুরু করেন।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিন এবং বাংলানিউজের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার তোফায়েল আহমেদসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
নাঈম উদ্দিন বলেন, ‘বহু ভাষার সন্ধ্যা’ অনুষ্ঠানের আলোচনা করতে উদ্যানে গিয়েছিরিহিত কোনো অবৈধ কাজ না করেও পুলিশ আমাদের মারধর করেছে। আমার আরেক বন্ধুকেও তারা পিটিয়েছে।’ তোফায়েল আহমেদও অভিযোগ করেছেন, তিনি সংবাদ সংগ্রহ করতে উদ্যানে গিয়েছিলেন।

ডিএমপি রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম ঘটনাটিকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এক মাদকাসক্তের হামলার কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয় এবং ভুলক্রমে কিছু সাংবাদিকের ওপরও মারধরের ঘটনা ঘটে।
তিনি আরও বলেন, অভিযানের অংশ হিসেবে সন্দেহভাজনদের তল্লাশির সময় কয়েকজন তর্কে জড়ায় এবং কাজ বাধা দেয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে তিনি নিজে হস্তক্ষেপ করে পুলিশ সদস্যদের থামান।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বাইরে, ঢাকার ধানমন্ডি লেক ও চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ রবিবার ও সোমবার অভিযান চালিয়ে কয়েকজন তরুণ ও কিশোরকে আটক করেছে। তাদের মারধর, কানে ধরে উঠবস করানো বা মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, আটককৃতদের বিরুদ্ধে মাদকসেবী বা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হয়েছে। গভীর রাতে কিছু কিশোর ও তরুণ নিয়মিত মাদকের ব্যবহার করছিল বলে দাবি করেছেন তারা।
তবে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ, মারধর বা অপমানের ক্ষমতা কোথায় শেষ।

পুলিশ কতটা শক্তি প্রয়োগ করতে পারে?
পুলিশের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ ও আইন ভঙ্গের অভিযোগ নতুন নয়। জনবান্ধব পুলিশিংয়ের কথা বলা হলেও অনেক সময় বাহিনীর কর্মকাণ্ডে প্রশ্ন ওঠে।
সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, পুলিশ কী করতে পারবে, কী পারবে না তা আইনে স্পষ্ট। বল প্রয়োগ অবশ্যই প্রয়োজনীয়, সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সীমিত হতে হবে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, বিশেষ করে জাতিসংঘের বেসিক প্রিনসিপলস বলছে, শক্তির প্রয়োগ হবে ‘অ্যাবসোলুটলি নেসেসারি’ এমন পরিস্থিতিতে। অর্থাৎ যেখানে অন্য কোনো উপায় নেই।
তিনি আরও বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দীর্ঘদিন ধরেই মাদকের আখড়া হয়ে আছে। পুলিশকে সেখানে কাজ করতে হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ বা ভুল আচরণ আইনের বাইরে যাবে না।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অভিযান ও টহলের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু জনগণকে মারমুখী করা বা অপমান করা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক।
“অতিরিক্ত কেউ কিছু করলে, পুলিশ হলে তাকেও আইনের আওতায় আসতে হবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনেকের মধ্যে আইন ভাঙার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেটাও ঠিক নয়,” বলে মনে করেন মি. মোরশেদ।
তিনি বলেন, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে পুলিশ অনেক সময় ভিন্নভাবে আচরণ করে। তবে পুলিশের কাজের বাধা সৃষ্টি বা অসৌজন্যমূলক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।’

