—রাহাদ সুমন; বরিশাল প্রতিবেদক
বিগত পাঁচ বছরের ব্যবধানে বরিশালের গৌরনদীতে চাঞ্চল্যকর পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় পাঁচটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামি গ্রেপ্তার হলেও অন্য চারটি হত্যাকাণ্ডের আজও রহস্য কিংবা আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।
সূত্রমতে, ২০২০ সালের ১৯ আগস্ট গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর থেকে নিজের ইজিবাইকে যাত্রী নিয়ে ভুরঘাটার দিকে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয় উজিরপুর উপজেলার মোড়াকাঠী গ্রামের আব্দুস সালাম রাঢ়ীর ছেলে মামুন রাঢ়ী। নিখোঁজের আটদিন পর ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী গৌরনদীর বার্থী ডিগ্রি কলেজের সামনের খাল থেকে ইজিবাইক চালক মামুনের ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
এ ঘটনায় নিহতের পিতা আব্দুস সালাম রাঢ়ী গৌরনদী মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনার দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও অদ্যবধি হত্যার রহস্য কিংবা কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
নিহতের ভাই সোহেল রানা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শুরুতেই গৌরনদী মডেল থানা পুলিশ মামলাটি তদন্ত শুরু করেন। পরবর্তীতে থানা পুলিশ হত্যার কোনো ক্লু উদ্ঘাটন করতে না পারায় মামলাটি পিবিআইকে তদন্তের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়। আদালতের বিচারক মামলাটি তদন্তের জন্য জেলা সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন। কয়েকদফা সিআইডির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলসহ তাদের (সোহেল) নিজ গ্রাম পরিদর্শন করে সন্দেহভাজন একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছেন।
তবে ঘটনার প্রায় সাড়ে পাঁচ বছরেও অদ্যবধি হত্যাকাণ্ডের কোনো ক্লু উদ্ঘাটন কিংবা নিহতের ব্যবহৃত ইজিবাইক উদ্ধার করতে পারেননি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তিনি (সোহেল রানা) হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন।
অপরদিকে ২০২৪ সালের ২০ জুলাই সকাল নয়টার দিকে গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামের গোলাম নবী হাওলাদারের পাটক্ষেত থেকে আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সের অজ্ঞাতনামা এক যুবকের লাশ উদ্ধার করেছে থানা পুলিশ। এ ঘটনায় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মরদেহটি ফুলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোসকা ও পচন ধরেছিল। লাশের দুই পায়ের হাঁটুর নিচে গোড়ালির উপরে মাংসপেশি বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাওয়া গেছে। তৎকালীন সময় পুলিশের ধারণা ছিল কোনো অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা ২০২৪ সালের ১৭ থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে ওই যুবককে হত্যা করে লাশ গুমের জন্য ওই পাটক্ষেতে ফেলে রেখে গেছে।
মামলার দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা গৌরনদী মডেল থানার এসআই মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, উপজেলার খাঞ্জাপুর গ্রামের চৌকিদার মাহবুব মৃধা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি করে লাশ উদ্ধারের দিন রাতেই থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। অজ্ঞাতনামা ওই লাশের মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে মেডিক্যাল পরীক্ষার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসআই নজরুল ইসলাম আরও জানিয়েছেন, নিহতের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় লাশটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। ঘটনার ১৫ মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত অজ্ঞাতনামা লাশের পরিচয় মেলেনি। যে কারণে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট গৌরনদী উপজেলার বড়দুলালী গ্রামের কালাম সিকদারের ছেলে ও বার্থী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সদস্য রাশেদ সিকদারকে চাঁদার দাবিতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের ভাই বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।
ওই মামলায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও বর্তমানে আসামিরা জামিনে রয়েছে। নিহতের ভাই রাসেল সিকদার বলেন, এক লাখ টাকার চাঁদার জন্য আমার ভাইকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করেছি। আসামিরা অল্পদিনের ব্যবধানে জামিনে বের হয়ে আসে। ফলে সঠিক বিচার পাব কি না তা নিয়ে আমরা সন্দিহান।
২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামের নিজ বাড়ির পুকুরের ঘাটলার নিচ থেকে ক্ষত অবস্থায় উপজেলা যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম হাওলাদারের (৪২) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের ভাই মাজহারুল ইসলাম বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
নিহতের ভাই মাজহারুল ইসলাম বলেন, ঘটনার চার মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার কিংবা হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গৌরনদী মডেল থানার এসআই আলাউদ্দিন জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলমান আছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এখনো হাতে পাইনি। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে কার্যক্রম চলছে।
সর্বশেষ চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি রাত এগারোটার দিকে গৌরনদী পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব কাসেমাবাদ এলাকায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ভ্যানচালক মঞ্জু বেপারী (৫০)। যাত্রী নামিয়ে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তরা তার পথরোধ করে উপর্যুপরিভাবে কুপিয়ে হত্যা করে।
এ ঘটনায় নিহতের পরিবার থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। নিহতের ছেলে স্বাধীন বেপারী অভিযোগ করে বলেন, আমার বাবাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় একজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রায় দেড় মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত হত্যার রহস্য কিংবা ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গৌরনদী মডেল থানার এসআই আরিফ হোসেন জানিয়েছেন, এ ঘটনায় সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে কিছু পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের শনাক্তকরণের কাজ চলমান রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে গৌরনদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু ছালেহ মো. আনছার উদ্দিন জানিয়েছেন, ক্লুলেস মামলাগুলোর রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য সিআইডির কাছে আবেদন করা আছে। এ ছাড়া মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের পাশাপাশি আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য নির্দেশনা দেওয়া আছে।

