বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সূচনা হয়েছিল গত শতকের আশির দশকে। তখন বিশেষায়িত কিছু পদে উপযুক্ত বিকল্প না পাওয়ায় সরকারকে এ পথ বেছে নিতে হয়েছিল। ১৯৯০ সালের শেষে এরশাদ সরকারের পতনের পর প্রশাসনের আরও গুরুত্বপূর্ণ পদেও চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। এরপর থেকে প্রায় সব সরকারই এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।
২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার তাদের শেষ তিন মেয়াদজুড়ে শত শত কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারও প্রশাসন পরিচালনায় এই পদ্ধতিকেই বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। বর্তমান নির্বাচিত সরকারও একই ধারায় এগোচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় এর ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই পেশাদার দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পায়—এমন অভিযোগ রয়েছে।
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ১৯৮১ সালের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (নিয়োগ) বিধিমালায় প্রথম সরকারকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের নিয়োগের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ মেয়াদগুলোতে চুক্তিতে নিয়োগের প্রবণতা তুঙ্গে ওঠে। সমালোচনার মুখে ২০১৪ সালে কাকে, কীভাবে এবং কত বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া যাবে—এ বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। বয়সসীমা নির্ধারণের কথাও ছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি জনস্বার্থে অবসরপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারীকে চুক্তিতে পুনঃনিয়োগ দিতে পারবেন। এরপর থেকে এই আইনের অধীনেই নিয়োগ চলছে।
বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজনের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে অন্তত ১২ জন সাবেক কর্মকর্তাকে চুক্তিতে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
সাধারণত রাষ্ট্রদূত, সচিব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, কমিশন ও কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, মহাপরিচালক, হাসপাতালের পরিচালক কিংবা রেলওয়ের কারিগরি পদে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হতো। গত এক যুগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের মতো শীর্ষ পদেও এই সংস্কৃতি বিস্তৃত হয়েছে।
আইন অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত যে কাউকে চুক্তিতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে এভাবে নিয়োগ দিলে পেশাদার কাঠামোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে—এমন মত প্রশাসনের ভেতরেই রয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, শীর্ষ পদগুলোতে বছরের পর বছর চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হলে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হয়। এতে অনেকেই মনঃক্ষুণ্ন হন।
আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদায়ন হলে কর্মদক্ষতার প্রতিযোগিতা বাড়ত। কিন্তু চুক্তি সংস্কৃতি বাড়ায় অনেকেই ভবিষ্যতের কথা ভেবে রাজনৈতিক আনুকূল্য অর্জনের চেষ্টা করেন। এতে প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কিছু কর্মকর্তার মতে, বর্তমান সরকারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। গত ১৬ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের অনুগত কর্মকর্তারাই শীর্ষ পদে ছিলেন। তাঁদের অবসরের পর পদোন্নতির তালিকায় থাকা অনেক কর্মকর্তাও একই সরকারের ঘনিষ্ঠ। ফলে বিএনপি সরকার নিয়মিত কাঠামোর মধ্য থেকে নিজেদের আস্থাভাজন ব্যক্তিকে বাছাই করতে সীমাবদ্ধতায় পড়ছে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, “কোনো সরকারই শুধু মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে শীর্ষ পদ বেছে নেয়নি। বিধিবিধান কঠোরভাবে মানা হলে হয়তো চুক্তিতে নিয়োগের প্রয়োজনই হতো না।”
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকার এখনো কিছুটা সংযত। তবে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়মিত কর্মকর্তাদের সুযোগ না দিলে আগের সরকারের মতো সমালোচনার মুখে পড়তে হবে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, “সরকার প্রয়োজন মনে করলে স্বল্প সময়ের জন্য কাউকে চুক্তিতে নিয়োগ দিতেই পারে। তবে তা যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিতে নিয়োগ দিলে নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।”
তিনি আরও বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় যেকোনো পদে যেকোনো ব্যক্তিকে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একেবারেই বিকল্প না পাওয়া গেলে স্বল্প সময়ের জন্য বিশেষায়িত পদে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে—কিন্তু এটি যেন ব্যতিক্রম থাকে, নিয়ম নয়।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রশাসনে নতুন নয়, তবে এর বিস্তার ও প্রয়োগের ধরন নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রশাসনিক প্রয়োজন এবং পেশাদার কাঠামোর ভারসাম্য—এই তিনের সমন্বয় কতটা সম্ভব, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়া চুক্তি সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে প্রশাসনের ভেতরে অনিশ্চয়তা ও অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

