দীর্ঘ দেড় দশকের একক প্রভাবশালী শাসন এবং পরবর্তী প্রায় ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সময়ের অস্থিরতা শেষে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১৫ দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর নানা সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এগুলোকে জনস্বার্থকেন্দ্রিক উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে জোর: সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে রেশন সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামী ১০ মার্চ বগুড়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রম উদ্বোধনের কথা রয়েছে।
হয়রানিমূলক মামলা পুনর্বিবেচনা: একই সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলা পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে করা কিছু হত্যা মামলা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক কিছুটা কমতে পারে।
অর্থনীতিতে আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ: অর্থনীতিতে স্থবিরতা কাটাতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ব্যাংক হিসাব জটিলতা নিরসন এবং হয়রানিমূলক মামলার বিষয়গুলো পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের আশা এসব পদক্ষেপে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলায় পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা: পুলিশ বাহিনী ও প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরাতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের শীর্ষ পদে রদবদল শুরু হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, অতীতের সমন্বয়হীনতা ও অদক্ষতার কারণে প্রশাসনে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কার্ড পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত: পূর্ববর্তী সময়ে বাতিল হওয়া ১৬৪ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড পুনর্বহালের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি সংবাদকর্মীদের পেশাগত অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।
প্রটোকল ও ব্যক্তিগত আচরণে পরিবর্তন: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা জনমনে আলাদা আলোচনা তৈরি করেছে। তিনি সরকারি গাড়ির পরিবর্তে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছেন এবং সংশ্লিষ্ট খরচ নিজে বহন করছেন বলে জানানো হয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে সচিবালয়ে উপস্থিত হয়ে কাজ শুরু করার বিষয়টিও প্রশাসনে শৃঙ্খলার বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া সড়কে চলাচলের সময় ট্রাফিক নিয়ম মানা, নিরাপত্তা বহর সীমিত রাখা, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ছাড়া জাতীয় পতাকা ব্যবহার না করা এবং সংসদ সদস্যদের জন্য করমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা না নেওয়ার ঘোষণা—এসব সিদ্ধান্তকে ভিন্নধর্মী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের ঘোষণাও সংসদীয় চর্চায় নতুন বার্তা দিয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।
বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া: ব্যবসায়ী আবুল কাসেম বলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক সাড়া মিলছে। তার মতে, দীর্ঘ সময়ের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশ ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হচ্ছে। সংসদ সদস্য ও শিক্ষক নেতা সেলিম ভূঁইয়া মনে করেন, সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো জনমনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা সেলিম উদ্দিনের ভাষ্য, নতুন সরকারের প্রাথমিক কিছু পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির অনুভূতি সৃষ্টি করেছে।
কিন্তু এই পদক্ষেপের মধ্যেও সামনে আরোও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ঘোষিত সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনের শীর্ষ স্তর থেকে মাঠপর্যায়ে পরিবর্তনের ধারা বজায় রাখা গেলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দ্রুত ফিরে আসতে পারে। দায়িত্বের প্রথম ১৫ দিনে নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে ঘিরে জনমনে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করতে হলে ধারাবাহিকতা ও কার্যকর বাস্তবায়নই হবে সরকারের জন্য মূল পরীক্ষা।

