মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বর্তমানে এক অচলাবস্থার মধ্যে। এ পথ দিয়ে ইরান, ইরাক, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সঙ্গে পণ্য আনা-নেওয়া হয়। কিন্তু গত সোমবার ইরান হঠাৎ হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করলে রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে গেছে। ইরানের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে রেভোল্যুশনারি গার্ড ও নৌবাহিনী আগুন ধরাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই সাত দেশ থেকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য। প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, তৈরি পোশাক, শাকসবজি, ফলমূল, হিমায়িত মাছ, জুতা ও ক্যাপ রপ্তানি করে বাংলাদেশের বহু প্রতিষ্ঠান।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, “যুদ্ধ দ্রুত থামছে না। মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাথমিকভাবে আমদানি-রপ্তানিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি সংকটও সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, দেশের কেরোসিন ছাড়া অন্যান্য জ্বালানির মজুত দুই থেকে চার সপ্তাহের, তাই বিকল্প উৎস থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি করার পরিকল্পনা আগে থেকেই তৈরি রাখা জরুরি।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, “পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দ্রুত ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে বসে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করবে, তা না হলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে।”
হাজার কনটেইনার আটকা পড়েছে:
ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি কনটেইনারের বুকিং স্থগিত করেছে শিপিং লাইনগুলো। চট্টগ্রাম বন্দর, বেসরকারি ডিপো এবং বিদেশের চার বন্দরে শতাধিক কনটেইনার আটকা পড়েছে। এসব কনটেইনারে খাদ্যপণ্য, পানীয় ও তৈরি পোশাক রয়েছে।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানির (এমএসসি) হেড অব অপারেশনস আজমীর হোসেন চৌধুরী জানান, তাদের প্রায় ২৫০ কনটেইনার আটকে আছে। রিভেরাইন ফিশ অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজের হিমায়িত মাছের ৪০ কনটেইনারও রপ্তানি বন্ধ রয়েছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানান, “মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের ৬০০ কনটেইনার রপ্তানি পণ্য আটকে আছে। আমদানিও বন্ধ। ১০-১২ হাজার টন পেট্রোকেমিক্যাল জাহাজীকরণ বাতিল হয়েছে। সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে যুদ্ধ না থামলে উৎপাদন ব্যাহত হবে।”
অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যেমন টি কে গ্রুপ, হিফস অ্যাগ্রো, চিটাগং এশিয়ান অ্যাপারেলসও একই পরিস্থিতির মধ্যে আছে। যেহেতু জাহাজ কোম্পানিগুলো নতুন বুকিং নিচ্ছে না, তাই আটকে থাকা চালানগুলি ডিপোতে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। এতে রপ্তানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, এবং কিছু পণ্যের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা অ্যাপারেলসের এমডি ফজলে শামীম এহসান জানিয়েছেন, “ঈদের আগে ছোট ক্রয়াদেশের পণ্য রপ্তানিও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এখন নতুন পণ্য পাঠাতে চাচ্ছে না। শ্রমিকদের বেতন-ভাতার বিষয়ও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।” সেলিম রায়হান মনে করছেন, “সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এখনই প্রস্তুতি নিয়ে বিকল্প আমদানি ও সমাধান তৈরি করতে হবে।”

