প্রায় দুই দশক ধরে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারার অভিযোগে সমালোচনার মুখে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংবিধান অনুযায়ী এটি একটি স্বাধীন সংস্থা। তবে বিভিন্ন সময়ে সরকারের নানা প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে কমিশনের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এর ফলে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা, ভিন্নমতের ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা হয়রানির শিকার হয়েছেন।
দুদক প্রতিষ্ঠার ২১ বছরে সাতটি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে। এর মধ্যে চারটি কমিশন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নেয়। বিষয়টি সংস্থাটির স্থিতিশীলতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন জাগিয়েছে।
দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, দুদকের কারও বন্ধু থাকার প্রয়োজন নেই। বন্ধুত্ব থাকলে সমঝোতার ঝুঁকি তৈরি হয়। তার মতে, দেশে অনেকেই নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখতে পারেন না। তারা প্রভাবশালী ব্যক্তির ভাবনা বা অবস্থান বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন। সবাই যদি আইন অনুযায়ী কাজ করেন, তাহলে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম বলেন, ‘দুদক আইন, ২০০৪’ অনুযায়ী কমিশন স্বাধীনভাবে তদন্ত, মামলা ও প্রসিকিউশনের সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ সব সময়ই রাজনৈতিক সরকার, ওয়ান-ইলেভেন সরকার বা অন্তর্বর্তী সরকারের সন্তুষ্টির ওপর নির্ভর করেছে বলে তার দাবি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বাধীন যাচাই-বাছাই হয়েছে—এমন নজির তিনি দেখেননি।
তিনি আরও বলেন, কোনো চেয়ারম্যান বা কমিশনারকে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করে টিকে থাকতে দেখা যায়নি। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়ার কারণে কর্মকর্তাদের মধ্যে অনুগত্যের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। আইন অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের মতো অপসারণ প্রক্রিয়া থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, দেশে দুর্নীতিবান্ধব একটি পরিবেশ বিরাজ করছে। এমন বাস্তবতায় দুদক একা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে না। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পরিবর্তন না এলে প্রকৃত স্বাধীনতা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে দুদকের সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, গত ২০ বছরে কমিশন হাজারো গুরুত্বপূর্ণ অভিযান ও তদন্ত সম্পন্ন করেছে। রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ, ব্যাংক জালিয়াতি, নিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে ভূমিকা রেখেছে সংস্থাটি। তবে হাতে গোনা কয়েকটি বিতর্কিত মামলা ও সিদ্ধান্তই পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে তাদের মত।
বিশেষ করে গত এক দশকে নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক বেড়েছে। বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম আলোচনায় আসে। দুদকের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে নাফিজ সারাফাত ও সালমান এফ রহমান-এর নাম ঘুরে ফিরে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা দুদকের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন। তাদের ইঙ্গিতে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হতো—এমন দাবি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের দালিলিক প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। আরও অভিযোগ আছে, আওয়ামী সরকারের সময়ে পুলিশ, প্রশাসন, দুদক, ব্যাংক, পুঁজিবাজার ও বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাতে তারা প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন।
প্রশাসনিক কাঠামো, বাজেট ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের সম্পৃক্ততা থাকায় বাস্তব স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুদকের নতুন কমিশন গঠিত হয়। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন। কমিশনার হন মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও হাফিজ আহসান ফরিদ। তবে দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই গত ৩ মার্চ তারা একযোগে পদত্যাগ করেন। নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাশা পূরণে সুযোগ করে দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তারা সরে দাঁড়ান। এতে দুদকের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্ন—দুদককে নিয়ন্ত্রণ করবে কে, এবং কমিশন কি প্রকৃত অর্থে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে? সমালোচকদের দাবি, বিরোধী নেতা, ব্যবসায়ী ও কিছু আমলার বিরুদ্ধে দুদকের তৎপরতা বেশি দেখা গেলেও ক্ষমতাসীন ঘনিষ্ঠদের ক্ষেত্রে একই মাত্রার সক্রিয়তা দেখা যায়নি। ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে কিছু মামলায় সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ আছে।
নতুন সরকারের আমলে দুদকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিরপেক্ষতা প্রমাণ করা। উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির অভিযোগে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। তদন্তে স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। সংবেদনশীল সময়ে মামলা দায়ের, তদন্তে অসামঞ্জস্য ও দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা মামলার মতো বিষয়গুলোও আস্থার পরীক্ষায় ফেলেছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
দুই দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, স্বাধীনতার প্রশ্নে সামান্য বিচ্যুতিও বড় বিতর্ক তৈরি করে। এখন দেখার বিষয়, ব্যক্তির নির্দেশ নয়, আইন ও সংবিধানের ভিত্তিতেই চলতে পারে কি না দুদক। সেই উত্তরই ঠিক করবে সংস্থাটির আগামী পথচলা।

