দেশের ই-কমার্স খাতে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কয়েক বছর আগে আলোচিত অনলাইন মার্কেটপ্লেস ইভ্যালির পতন পুরো খাতকে নাড়েছিল। সেই স্মৃতি এখনো মুছে যায়নি। এই প্রেক্ষাপটে দেশের অন্যতম অনলাইন গ্রোসারি প্ল্যাটফর্ম চালডাল ডটকম ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কর্মীদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৬০০ জন কর্মকর্তা চার মাস ধরে বেতন পাননি। এ অভিযোগের মধ্যেই যশোরে তাদের সহস্রাধিক কর্মী বিক্ষোভ করেছেন। ফটক ভাঙচুরের ঘটনায় একজন আহত হয়েছেন। চালডাল ডটকমের কর্মীরা জানান, মালিকপক্ষ মাসিক মাত্র ছয়-সাত হাজার টাকা বেতন ধরে থাকলেও গত কয়েক মাস ধরে নিয়মিত বেতন দিচ্ছে না। কেউ কেউ আংশিক বেতন পেয়েছেন, তবে অধিকাংশ কর্মী গত তিন থেকে চার মাস কোনো বেতন পাননি।
কর্মীদের ভাষ্য, তারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন। অর্ডার প্রসেসিং, কাস্টমার সাপোর্ট, গুদাম ব্যবস্থাপনা ও ডেলিভারি কার্যক্রম অব্যাহত আছে। তবে মাস শেষে বেতন না পাওয়ায় অনেকেই ধার-দেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
গত সোমবার যশোর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির কল সেন্টার কার্যালয়ে কর্মীরা বকেয়া বেতনের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করেন। পার্কের ১২ ও ১৪ তলায় অবস্থান নিয়ে তারা অভিযোগ করেন, বেতন না পেলে কাজ চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাইরে অবস্থানরত কয়েকজন কর্মী ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে পার্ক কর্তৃপক্ষ প্রধান ফটক বন্ধ করেন। উত্তেজিত কর্মীরা ফটকে ভাঙচুর চালান। এ সময় শাহীন নামের একজন কর্মী মাথায় মারাত্মক আঘাত পান এবং যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি হন। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আকাশ আকবর জানান, তিনি প্রিমিয়াম কেয়ার অ্যাসোসিয়েট পদে চার বছর ধরে কাজ করছেন। কিন্তু ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস বেতন পাননি। বাধ্য হয়ে আন্দোলনে নেমেছেন।
চালডাল ডটকমের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) দুর্লভ বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি এখানে চাকরি করেন। বেতন চাইতে গেলে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। সোমবার সকালে বেতন বিষয়ে জানতে চাইলে কল সেন্টারের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন কর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় এবং চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরই কর্মীরা বিক্ষোভে নেমেছেন।
২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটির যশোর কার্যালয়ে সহস্রাধিক কর্মী কাজ করেন। তাদের মধ্যে অনেক শিক্ষার্থী ও পার্টটাইম কর্মী। টানা কয়েক মাস বেতন বন্ধ থাকায় তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পার্কের ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা মধ্যস্থতার চেষ্টা করছেন।
ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ শাহজালাল জানান, বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে অর্থ কীভাবে এবং কখন সরবরাহ হবে তা এখনও জানা যায়নি। যশোর অফিসের ফোকাল পারসন শাহাদত হোসেন মিঠুন বলেন, হঠাৎ আর্থিক সংকটে প্রতিষ্ঠানটি সমস্যায় পড়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও নতুন বিনিয়োগ না আসায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। নোটিস দিয়ে কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণার পরই কর্মীরা বিক্ষোভ শুরু করেন।
একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে অর্থ না থাকা এবং টানা কয়েক মাস কর্মীদের বেতন বকেয়া রাখা নগদ প্রবাহ সংকটের ইঙ্গিত দেয়। যদিও ইভ্যালির মতো গ্রাহকের অর্থ আটকে যাওয়ার ঘটনা এখনও ঘটেনি, তবু কর্মীদের দীর্ঘ বকেয়া বেতন প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। চালডাল ডটকমের সিইও ওয়াসিম আলিম বিষয়টি সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, “চালডাল দাবি করছে তারা প্রতিদিন ৬৫ থেকে ৮০ হাজার পণ্য ডেলিভারি করে। তবু তিন-চার মাস কর্মীদের বেতন কেন দিতে পারছে না, এটা প্রশ্নবিদ্ধ।”
শ্রম আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেতন পরিশোধ বাধ্যতামূলক। দীর্ঘ সময় বেতন বকেয়া থাকলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে অনেক কর্মী চাকরি হারানোর আশঙ্কায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে দ্বিধা বোধ করছেন। নগদ সংকট দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ চেইনেও প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন। সূত্র: শেয়ার বিজ

