ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের এক হাজারের বেশি কারখানায় শ্রমিক ও কর্মচারীদের বেতন-বোনাস বকেয়া পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কারখানায় অস্থিরতা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য আগে থেকেই তৎপর রয়েছে গোয়েন্দা ও শিল্প পুলিশ। যেসব প্রতিষ্ঠানে বকেয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেসব কারখানার মালিকদের সঙ্গে বৈঠকও শুরু করেছে তারা।
শিল্প পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, “এবারও কিছু কারখানার শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধে সমস্যা রয়েছে। মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে যাতে শ্রমিকদের আন্দোলনের ঝুঁকি এড়ানো যায়। বৈঠকের মাধ্যমে বকেয়া পরিশোধের চেষ্টা করা হচ্ছে।”
শিল্প পুলিশ সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত বেতন বকেয়া বা বকেয়ার শঙ্কা রয়েছে এমন এক হাজারের বেশি কারখানা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে ৭৪৭টি কারখানায়। এছাড়া ঈদকে কেন্দ্র করে অন্তত ২৬৬টি কারখানায় বেতন-বোনাস বকেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গোয়েন্দারা এসব কারখানায় নজরদারি বাড়িয়েছে। অনেক কারখানার মালিক বিদেশে আছেন বা দেশের মধ্যে আত্মগোপনে রয়েছেন। মালিক না থাকায় বেতন বকেয়া থাকলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। তবে শিল্প পুলিশ ও গোয়েন্দারা এমন পরিস্থিতি এড়াতে আগে থেকেই সতর্ক।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত ঢাকার সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে তিনটি কারখানায় বেতন-ভাতা না দেওয়ার কারণে কারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবাদে শ্রমিকরা কর্মবিরতি, অবস্থান কর্মসূচি এবং সড়ক অবরোধ করেছেন।
পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরের গাছা এলাকার রাবার ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বরপা এলাকার ব্রি-ব্রাদার্স গার্মেন্টস লিমিটেড এবং সাভারের বিরুলিয়ার এমট্রানেট লিমিটেড-এ মোট ৫ হাজার ৬৮১ শ্রমিক কাজ করেন। এসব কারখানায় বকেয়া বেতন-ভাতা প্রায় ৮.৫ কোটি টাকা।
রাবার ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডে ১ হাজার ২৫০ শ্রমিকের পাওনা বেতন না দিয়ে হঠাৎ কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ১৮ ফেব্রুয়ারি শ্রমিকেরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। মালিক আওয়ামী লীগ নেতা জাইম আহম্মেদের। ওই কারখানার বকেয়া প্রায় ৫ কোটি টাকা। পরিস্থিতি ঠাণ্ডা করতে ২৫ ফেব্রুয়ারি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তি হয়।
ব্রি-ব্রাদার্স গার্মেন্টস লিমিটেডে জানুয়ারি মাসের বেতন না দেওয়ায় ১ হাজার ১৫০ শ্রমিক বিক্ষোভ করেন। এক পর্যায়ে তারা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এই কারখানার বকেয়া বেতন-ভাতা প্রায় ২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। সাভারের এমট্রানেট লিমিটেডেও বকেয়া বেতনকে কেন্দ্র করে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
শিল্প পুলিশ ও গোয়েন্দারা ঈদকে সামনে রেখে সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। যেসব কারখানায় বেতন-বোনাস আটকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেসব কারখানাতেও একইভাবে তৎপরতা চালানো হচ্ছে। মজুরি বকেয়া কারখানার তালিকা তৈরির পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। মালিক, শ্রমিক এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সমন্বয়ে সমাধান করা হচ্ছে।
গার্মেন্ট শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্র বলেছে, ঈদের আগে শতাধিক কারখানার মালিক শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দিতে ব্যর্থ হতে পারেন। এ পরিস্থিতিতে সরকার নগদ প্রণোদনা এবং এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ সহজ শর্তের ঋণসুবিধা চালু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। ব্যাংকগুলো শ্রমিকদের এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ ঋণ দিতে পারবে। এছাড়া রপ্তানির বিপরীতে বকেয়া নগদ সহায়তার জন্য বরাদ্দ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক সাদেকুর রহমান শামীম বলেন, “প্রতিবছরই ঈদের আগে বকেয়া বেতন-ভাতা নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন হয়। এবারও শ্রমিকরা তাঁদের প্রাপ্য অধিকার পেতে চাই।”

