রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘র্যাব’ বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংগঠনটির মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বিতর্কিত হয়ে ওঠা এই বাহিনীর পরিবর্তে বিদ্যমান গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী ও সংস্কার করা প্রয়োজন।
আজ বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সকালে ঢাকার ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে ‘সরকারের সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ কৌশলগত প্রাধান্য: টিআইবির সুপারিশ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ডক্টর ইফতেখারুজ্জামান।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ বহুবার উঠেছে র্যাবের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে র্যাব বিলুপ্ত করে অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেন।
তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করা হলে আলাদা বাহিনীর প্রয়োজন কমে আসবে। এইজন্য স্বাধীন পুলিশ কমিশন আইন করার আহ্বান জানান তিনি। টিআইবির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ–২০২৫’ গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এটি বাতিল করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ও কার্যকর পুলিশ কমিশন গঠনের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক নিয়োগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাতমুক্ত এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিতে হবে। এ কারণে নবনিযুক্ত গভর্নরের নিয়োগ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর ভাষায়, যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আর্থিক খাতে অনিয়ম বা লুটপাটের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের প্রভাবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে—এমন বক্তব্যের প্রশংসা করলেও বাস্তবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদেরও এ বিষয়ে কঠোর বার্তা দিতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা–কর্মী বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মধ্যে “সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার” মনোভাব তৈরি হলে তা সরকারের জন্যই ক্ষতিকর হবে।
টিআইবি আরও প্রস্তাব দিয়েছে, কালো টাকা বৈধ করার প্রচলিত ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে একটি নির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা উচিত। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বন্ধ করার কথাও বলা হয়েছে।
সুশাসন বাস্তবায়নে সমন্বিত পরিকল্পনার ওপর জোর দেয়েছে টিআইবি। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নির্বাচনী ইশতেহার ও ঘোষিত নীতিমালার আলোকে সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমকে সব সরকারি পরিকল্পনার মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া সরকারের অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে বলেও মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি আরো বলেন দুর্নীতির উৎস, ঝুঁকি ও প্রক্রিয়া চিহ্নিত করে সেগুলো মোকাবিলায় কৌশল নির্ধারণ করলে সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে।

