দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎচাহিদা পূরণের লক্ষ্যেই এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি নানা ধরনের বিলম্ব, ব্যয়বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে। ফলে রূপপুরকে ঘিরে জনমনে সংশয় ও প্রশ্ন দিন দিন বাড়ছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে আগামী জুনের শেষ সপ্তাহ বা জুলাইয়ের প্রথম দিকে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরু হবে। এরপর কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা—যেমন ‘হট রান’ ও ‘কোল্ড রান’—সম্পন্ন করার পর উৎপাদন শুরু করা হবে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময়সূচিও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সময়সীমা বারবার পিছিয়েছে
রূপপুর প্রকল্পের ইতিহাসে সময়সীমা একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যেই প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারী, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে সেই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালেও নতুন সময়সীমা ঘোষণা করা হলেও প্রতিবারই তা পিছিয়েছে।
প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে প্রায়ই অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে। ফলে প্রকল্পের অগ্রগতি ধীর হয়ে যায় এবং সময়সূচি আরও পিছিয়ে যায়।
ব্যয় বেড়েছে হাজার কোটি টাকা
রূপপুর প্রকল্প নিয়ে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো এর ব্যয়বৃদ্ধি। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বর্তমানে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি, নির্মাণ ব্যয় বাড়া এবং প্রযুক্তিগত সংযোজনের কারণে এই ব্যয় বৃদ্ধি হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘসূত্রতা, পরিকল্পনার দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক জটিলতাও ব্যয় বৃদ্ধির বড় কারণ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে কিছুটা ব্যয় বাড়া স্বাভাবিক হলেও রূপপুর প্রকল্পে ব্যয়ের এই বৃদ্ধি উদ্বেগজনক। কারণ প্রকল্পের বড় অংশের অর্থায়ন বিদেশি ঋণের মাধ্যমে হওয়ায় ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব
রূপপুর প্রকল্পের প্রযুক্তি এবং বিশেষজ্ঞদের বড় অংশই রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। ফলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এই প্রকল্পেও পড়েছে।
যন্ত্রপাতি সরবরাহে বিলম্ব, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের যাতায়াতে বাধা এবং সরবরাহ চেইনে জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ ধীর হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি প্রকল্পের অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে।
দক্ষ জনবল ও পারমাণবিক বর্জ্য নিয়ে উদ্বেগ
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য উচ্চ প্রশিক্ষিত জনবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে কিছু বাংলাদেশি প্রকৌশলীকে রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব দক্ষ জনবল তৈরি করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
এ ছাড়া পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে যে বর্জ্য তৈরি হয়, তা দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সামান্য ত্রুটিও ভবিষ্যতে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
উৎপাদন ক্ষমতা ও বিদ্যুৎ সংকট
রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত নেওয়া হবে, যা সম্পূর্ণ হতে ৮ থেকে ১০ মাস সময় লাগতে পারে।
ফলে কেন্দ্রটি চালু হলেও স্বল্পমেয়াদে দেশের বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে এর প্রভাব সীমিত হতে পারে।
সম্প্রতি প্রকল্পের মোট মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের প্রাথমিক হস্তান্তরের সময়সীমা ধরা হয়েছে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর। অর্থাৎ পুরো প্রকল্প পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হতে এখনো কয়েক বছর সময় লাগবে।
ঝুঁকি নাকি দীর্ঘমেয়াদি লাভ?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, দেশের বিদ্যুৎচাহিদা ও আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় এত বড় পারমাণবিক প্রকল্প কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা অন্যান্য বিদ্যুৎ প্রকল্পে দ্রুত ফল পাওয়া যেত।
তবে সরকারের যুক্তি হলো, দেশের গ্যাস মজুদ কমে আসছে এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জ্বালানি খাতের জন্য একটি বড় মাইলফলক হলেও প্রকল্পটি এখনো নানা প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে। আগামী কয়েক মাসে যদি সত্যিই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়, তাহলে সেটি হবে বড় অগ্রগতি। তবে অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে অনেকের মনে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত কতটা সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে।

