ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল আলোচিত তৃতীয় টার্মিনাল বিপুল ব্যয়ে নির্মাণ করা হলেও পরিচালনাগত জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এটি চালু করা সম্ভব হয়নি। প্রায় তিন বছর ধরে অব্যবহৃত থাকা এই টার্মিনাল অবশেষে চালুর পথে অগ্রসর হচ্ছে বলে জানা গেছে।
পরিচালনা-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে জাপান থেকে একটি কারিগরি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসছে। আগামী ১১ মার্চ তাদের সঙ্গে তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা ও দ্রুত চালুর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
জাপানের এই প্রতিনিধি দলের সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)-এর সদস্য এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান। তিনি জানান, সফরের সময় অনুষ্ঠিত বৈঠকে তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে।
সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে অংশ নিতে জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সহকারী উপমন্ত্রী এবং দেশটির আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলবিষয়ক মহাপরিচালক রিকো নাকায়ামা প্রতিনিধি দল নিয়ে ঢাকায় আসছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানকে নীতিগতভাবে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই বিষয়টি চূড়ান্ত করতে তাদের কারিগরি দল ঢাকায় আসছে।
তবে পরিচালনার বিভিন্ন সেবা ও ফি নির্ধারণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও দরকষাকষি হবে। কারণ জাপানের দেওয়া আগের প্রস্তাব অনুযায়ী যাত্রীদের খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং সরকারের ওপরও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান সরকার শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরের মডেল অনুসরণ করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
এই মডেল অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জাপান টার্মিনালটি পরিচালনা করবে এবং পরিচালনা থেকে অর্জিত আয় দিয়ে তাদের দেওয়া ঋণের অর্থ তুলে নেবে। এতে বাংলাদেশ সরকারকে আলাদাভাবে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হবে না।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট) ভিত্তিতে জাপানের কাছে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সেই পরিকল্পনা বাতিল করে দেয়।
পরে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু একাধিক বৈঠক ও সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পরও টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
বেবিচক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছরের ডিসেম্বরে জাপানের সুমিতোমো করপোরেশন থেকে তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার একটি প্রস্তাব পাওয়া যায়।
সেই প্রস্তাব অনুযায়ী বিদেশ ভ্রমণকারী যাত্রীদের এম্বারকেশন ফি ৫০০ টাকা (৪ ডলার) থেকে বাড়িয়ে ১২ ডলার করার কথা বলা হয়। এছাড়া টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিষ্ঠানটি কোনো অর্থ ব্যয় করবে না বলেও জানানো হয়।
এই শর্তগুলোকে বেবিচক বাস্তবসম্মত মনে করেনি এবং তা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। বাকি অর্থ ঋণ হিসেবে দিয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)।
প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই টার্মিনালে রয়েছে:
-
১১৫টি চেক-ইন কাউন্টার
-
৬৬টি ডিপারচার ইমিগ্রেশন ডেস্ক
-
৫৯টি অ্যারাইভাল ইমিগ্রেশন ডেস্ক
-
৩টি ভিআইপি ডেস্ক
টার্মিনালটি চালু হলে যাত্রীসেবা দেওয়ার সক্ষমতা বছরে ৮০ লাখ থেকে বেড়ে ২ কোটি ৪০ লাখে উন্নীত হবে। পাশাপাশি কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে প্রতি বছর ১০ লাখ টনে পৌঁছাবে।
টার্মিনালের নির্মাণকাজ প্রায় ৯৯ শতাংশ সম্পন্ন হলেও অপারেটর নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের কারণে এখনো কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।
এর আগে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর তৃতীয় টার্মিনালের সীমিত পরিসরে ব্যবহারের জন্য সফট ওপেনিং করা হয়েছিল। তবে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ না হওয়ায় কার্যত এটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
টার্মিনাল প্রকল্প ঘিরে বিভিন্ন জটিলতাও তৈরি হয়েছে। নির্মাণকাজের অর্থ পরিশোধ নিয়ে বেবিচক এবং বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)-এর মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক সালিশি বোর্ডের রায়ে বেবিচককে প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে প্রকল্প ঘিরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এ ছাড়া নকশাগত ত্রুটির কারণে সিলিং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং টার্মিনালের ভেতরে পর্যাপ্ত মোবাইল নেটওয়ার্ক কাভারেজ না থাকার বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করেছে। বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে এ অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা) এবং প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত তৃতীয় টার্মিনাল পরিদর্শন করেছেন। তারা প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে দ্রুত এটি চালুর জন্য সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিচালনাগত জটিলতা দ্রুত সমাধান হলে দেশের সবচেয়ে আধুনিক এই টার্মিনাল চালু হওয়ায় আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ও যাত্রীসেবায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

