রংপুরের কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, অধ্যক্ষ বছরের পর বছর কলেজে উপস্থিত না থাকলেও নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে অনেক শিক্ষক শুধু হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে যান। ফলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত কমে এসেছে।
সম্প্রতি উপজেলার কৃষ্ণমঙ্গল স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে দেখা যায়, দিনের মাঝামাঝি সময়েও প্রতিষ্ঠানটি প্রায় জনশূন্য। শ্রেণিকক্ষ, মাঠ কিংবা অফিসে শিক্ষার্থী বা শিক্ষকদের তেমন উপস্থিতি নেই। অধ্যক্ষের কক্ষও তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। শুধু একজন অফিস সহকারী নিজ কক্ষে কাজ করছিলেন। সাংবাদিক উপস্থিতির খবর পেয়ে কয়েকজন শিক্ষক পরে কলেজে ফিরে আসেন।
অভিভাবকদের অভিযোগ, অধ্যক্ষ মো. মাহমুদ হাসান দীর্ঘদিন কলেজে না আসার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ভেঙে পড়েছে। তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগে অনেক শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নেন না। এ পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের অন্য কলেজে ভর্তি করিয়ে নিয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটিতে এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম।
জানা যায়, অধ্যক্ষের দীর্ঘ অনুপস্থিতি ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ওই ঘটনার পর ১৯ সেপ্টেম্বর তদন্ত করে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দপ্তর একটি প্রতিবেদন দেয়, যেখানে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
তদন্তের ভিত্তিতে একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর কলেজের পরিচালনা কমিটি অধ্যক্ষকে সাময়িক বরখাস্ত করে। তবে তিনি সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করলে আদালত বরখাস্ত আদেশ বাতিলের নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশ অনুসারে ২০২৫ সালের ২ জুন কলেজ কর্তৃপক্ষ বরখাস্তের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে তাঁকে বকেয়া বিল-ভাতা প্রদান করে। এরপরও কলেজে তাঁর উপস্থিতি নিয়মিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। কলেজের অফিস সহকারী হারুনুর রশিদ বলেন, অধ্যক্ষ প্রায় আট বছর ধরে নিয়মিত কলেজে আসেন না। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগও খুব কম হয়। অনেক শিক্ষক এসে হাজিরা খাতায় সই করে আবার চলে যান।
প্রতিষ্ঠানটির কলেজ ও স্কুল শাখা মিলিয়ে মোট শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৪৫ জন। বর্তমানে কলেজ শাখার প্রথম বর্ষে ১১ জন এবং দ্বিতীয় বর্ষে ৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। মাধ্যমিক শাখায় শিক্ষার্থী সংখ্যা মাত্র ৪১ জন। কলেজের প্রভাষক নজরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন আসে না। তাই নিয়মিত ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় শিক্ষার্থী না থাকায় পাঠদান বন্ধ থাকে।
একজন শিক্ষার্থী রিনা আক্তার জানান, কলেজে গিয়ে কোনো ক্লাস না হওয়ায় তিনি এখন আর নিয়মিত যান না। তাঁর কয়েকজন সহপাঠী অন্য কলেজে ভর্তি হয়েছে, আবার কেউ বিয়েও করে ফেলেছে। আরেক শিক্ষার্থী মাহজাবীন আক্তার বলেন, পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি বাড়ির কাছের এই কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু কলেজের এই অচলাবস্থার কারণে তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে এবং পরিবার পরে তাঁর বিয়ে দিয়ে দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মহুবর রহমান বলেন, কলেজে অধ্যক্ষ আসেন না, শিক্ষার্থীরাও আসে না। জাতীয় সংগীত কিংবা পতাকা উত্তোলনের মতো নিয়মিত কার্যক্রমও হয় না। তাই বাধ্য হয়ে তিনি তাঁর সন্তানকে অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়েছেন। সাবেক শিক্ষক মো. আব্দুস ছামাদ বলেন, এলাকার দরিদ্র মানুষের উদ্যোগে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে এখন সেটি ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম অভিযোগ করেন, কলেজে চাকরি পাওয়ার আশায় তিনি অধ্যক্ষকে টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু চাকরি পাননি এবং সেই টাকা ফেরতও পাননি। একই ধরনের অভিযোগে আরও কয়েকজন আদালতে মামলা করেছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. আব্দুল ওয়াহিদ বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. হায়দার আলী বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর অধ্যক্ষকে কলেজে আসতে বলেছেন। তবে কিছু আর্থিক লেনদেনের জটিলতার কারণে তিনি কলেজে যেতে সংকোচ বোধ করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে অধ্যক্ষ এক মাসের চিকিৎসাজনিত ছুটিতে আছেন বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে অধ্যক্ষ মো. মাহমুদ হাসানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে কল কেটে দেন। পরে একাধিকবার চেষ্টা করলেও তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

