মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বিমান চলাচল ও প্রবাসী খাতে। ফ্লাইট অনিশ্চয়তা ও বাতিলের কারণে বিপাকে পড়েছেন হাজারো শ্রমিক, প্রবাসী, শিক্ষার্থী এবং ওমরাহ করতে যাওয়া হাজীরা।
অনেক শ্রমিক জীবনের সঞ্চয় বা সহায়-সম্বল বিক্রি করে ভিসা ও টিকিটের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা নির্ধারিত সময়ে বিদেশে যেতে পারছেন না। কবে যেতে পারবেন, সেটাও নিশ্চিত নয়। এতে করে তাদের চাকরি আদৌ থাকবে কি না, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
শুধু নতুন কর্মীরা নন, ছুটিতে দেশে আসা অনেক প্রবাসীও এখন সমস্যায় পড়েছেন। ফ্লাইট অনিশ্চয়তার কারণে তারা সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। ফলে তাদের চাকরি হারানোর শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন ওমরাহ হাজীরা
ওমরাহ করার উদ্দেশ্যে সীমিত বাজেট নিয়ে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন অনেক হাজী। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট অনিয়মিত হওয়ায় অনেকেই সেখানে আটকে পড়েছেন।
অনেক হাজীর সঙ্গে থাকা টাকা শেষ হয়ে গেছে। কেউ কেউ পরিবার থেকে টাকা এনে খরচ চালাচ্ছেন, আবার কেউ ঋণ করে দিন পার করছেন।
ক্ষতির মুখে এভিয়েশন খাত
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে যে ক্ষতি হচ্ছে তা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগবে। স্বাভাবিক ফ্লাইট পরিচালনা না হওয়ায় যেমন বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও প্রবাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী, পর্যটক এবং আটকে পড়া হাজীরাও গন্তব্যে যেতে পারছেন না।
এখন পর্যন্ত ঠিক কতজন শ্রমিক বা প্রবাসী আটকে পড়েছেন তার নির্দিষ্ট হিসাব নেই। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, সংখ্যাটা কম নয়।
তবে কিছু বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করে অনেক আটকে পড়া যাত্রীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ থেকেও কিছু ফ্লাইটের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রী পাঠানো হয়েছে।
৯ দিনে ২৪৮টি ফ্লাইট পরিচালনা
এয়ারলাইন্স সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ দিনে বিভিন্নভাবে মোট ২৪৮টি ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়েছে। এসব ফ্লাইটে অনেক যাত্রী তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছেন।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধীরে ধীরে বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলো আবার চালু করা হবে বলে জানিয়েছে এয়ারলাইন্সগুলো। তখন বাতিল হওয়া টিকিটগুলো অতিরিক্ত চার্জ ছাড়াই রি-শিডিউল করার সুবিধা দেওয়া হবে।
টিকিট বিক্রি প্রায় বন্ধ
সায়মন ওভারসিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফসিয়া জান্নাত সালেহ বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির পুরো প্রভাব এসে পড়েছে এভিয়েশন খাতে।
তার মতে,
“আমাদের বেশির ভাগ টিকিট বিক্রি হয় মধ্যপ্রাচ্যের যাত্রীদের কাছে। আবার ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক যাত্রীও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যাতায়াত করেন। ফলে এই সংকটে আমাদের ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
তিনি জানান, বর্তমানে নতুন টিকিট ইস্যু প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং পুরোনো টিকিটগুলো রি-শিডিউল করা হচ্ছে। অনেক এয়ারলাইন্স কোনো অতিরিক্ত চার্জ ছাড়াই টিকিট রিফান্ডের সুযোগও দিচ্ছে।
শ্রমিক থেকে এয়ারলাইন্স—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত
ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের জিএসএ ও রিদম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহাগ হোসেন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে পুরো এভিয়েশন খাতে বড় ধাক্কা লেগেছে।
তার ভাষায়, শ্রমিকদের পাশাপাশি এয়ারলাইন্স ও ট্রাভেল এজেন্সির মালিকরাও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
কোভিডের মতো সংকট
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক মো. কামরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা কোভিড মহামারির সময়কার মতো।
তিনি বলেন,
“এখন পুরো এভিয়েশন খাত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ফ্লাইট পরিচালনা না করলেও বিমান পার্কিং করে রাখার জন্য চার্জ দিতে হচ্ছে। যদি কর্তৃপক্ষ কিছু সহায়তা দেয়, তাহলে এয়ারলাইন্সগুলো কিছুটা স্বস্তি পাবে।”
তিনি আরও জানান, ইউএস-বাংলা বর্তমানে দুবাই রুটে কিছু ফ্লাইট পরিচালনা করছে এবং যাত্রীদের কোনো অতিরিক্ত চার্জ ছাড়াই টিকিট রি-শিডিউলের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
আটকে পড়া হাজীদের ফেরাতে বিশেষ ফ্লাইটের দাবি
ইউনাইটেড লিংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের জিএসএ আহমেদ ইউসুফ ওয়ালিদ বলেন, প্রতিদিনই ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় অনেক যাত্রী গন্তব্যে যেতে পারছেন না।
তিনি বলেন,
“বাংলাদেশ থেকে যারা কাজ, ব্যবসা বা পড়াশোনার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার কথা ছিল তারা যেতে পারছেন না। আবার মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবসায়ী ও পর্যটকরাও বাংলাদেশে আসতে পারছেন না। ফলে দেশের অনেক তারকা হোটেল প্রায় ফাঁকা।”
তিনি আরও জানান, ওমরাহ করতে যাওয়া অনেক হাজী সেখানে আটকে পড়েছেন এবং অর্থ সংকটে ভুগছেন। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ ফ্লাইট চালুর জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ইউএস-বাংলা ও এমিরেটস কিছু ফ্লাইট পরিচালনা করে দুবাই থেকে অনেক আটকে পড়া যাত্রীকে ইতোমধ্যে দেশে ফিরিয়ে এনেছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, মার্চের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ায় আবারও বড় ধাক্কা খেয়েছে দেশের এভিয়েশন খাত।

