দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখন উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শেষ হয়েছে। এখন চলছে চূড়ান্ত পরিদর্শন ও প্রস্তুতির কাজ।
সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আগামী মাসে রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পারমাণবিক জ্বালানি (ফুয়েল) লোড করা হবে। এরপর সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী জুনের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
এই তথ্য জানিয়েছেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল) এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের সংকট চলছে। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ অবস্থায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা গেলে বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। এতে লোডশেডিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর চাপও কমবে।
রূপপুর প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিটের হট রান, কোল্ড রানসহ সব ধরনের প্রযুক্তিগত পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
বর্তমানে চলছে চূড়ান্ত ইন্সপেকশন বা পরিদর্শন কার্যক্রম। এরপর পারমাণবিক জ্বালানি লোড করা হবে এবং ধাপে ধাপে পাওয়ার স্টার্টআপ প্রক্রিয়া শুরু হবে।
প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রটি থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বর নাগাদ প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণ ক্ষমতায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম গতকাল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর।
পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন,
“রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। এটি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে।”
রূপপুর প্রকল্পের শুরুতে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। তবে বিভিন্ন কারণে ব্যয় বেড়ে বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকায়।
অর্থাৎ প্রকল্পটির ব্যয় ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংকটের কারণে মালামাল সরবরাহে বিলম্ব হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণেও প্রকল্পের সময়সূচি পিছিয়ে যায়।
মূল চুক্তি অনুযায়ী রূপপুরের প্রথম ইউনিট চালুর সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের অক্টোবর এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ২০২৪ সালের অক্টোবর।
কিন্তু বিলম্বের কারণে নতুন করে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে—
-
প্রথম ইউনিট: ডিসেম্বর ২০২৬
-
দ্বিতীয় ইউনিট: ডিসেম্বর ২০২৭
এ বিষয়ে গত বছরের ২০ জুন রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর জন্য সব প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে।
তার ভাষায়,
“আগামী এপ্রিলে ফুয়েল লোড করা হবে। এরপর জুনে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, অর্থাৎ প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হবে।”
তিনি আরও জানান, পর্যায়ক্রমে ডিসেম্বর নাগাদ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি) প্রয়োজনীয় গ্রিড লাইন প্রস্তুত করেছে এবং বিপিডিবির সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে গ্রীষ্ম মৌসুমে প্রতি বছর প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকে। এই চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্মকালে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। রূপপুর থেকে যদি ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা যায়, তাহলে ব্যয়বহুল জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবহার কমবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও কমে আসবে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহিদুল হাসান জানিয়েছেন, ফুয়েল লোডিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি বলেন,
“আমরা হট রান, কোল্ড রানসহ সব পরীক্ষা সফলভাবে শেষ করেছি। এখন কিছু যন্ত্রপাতি খুলে চূড়ান্ত পরীক্ষা করা হচ্ছে। যদি সব নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া যায়, তাহলে আগামী মাসেই ফুয়েল লোডিং শুরু হতে পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি চালু হলে এটি দেশের বিদ্যুৎ খাতে এক নতুন যুগের সূচনা করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

