জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কর্মরত আটজন পাইলটের লাইসেন্স প্রাপ্তির প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ভুয়া লগবুক, জাল নথি এবং তথ্য গোপনের মাধ্যমে তারা লাইসেন্স ও চাকরি পেয়েছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিমান কর্তৃপক্ষ একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ের অনুসন্ধানে কয়েকজন পাইলটের উড্ডয়ন ঘণ্টা সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। তদন্তে উঠে এসেছে—কিছু ক্ষেত্রে লগবুকে উল্লেখ করা সময়ের সঙ্গে বাস্তব উড্ডয়ন অভিজ্ঞতার মিল নেই।
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ক্যাপ্টেন আব্দুর রহমান আকন্দের বাণিজ্যিক পাইলট লাইসেন্স পেতে প্রয়োজন ছিল ২৫০ ঘণ্টা উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা। কিন্তু তার লগবুকে পাওয়া গেছে মাত্র ১৫৪ ঘণ্টা ২১ মিনিটের মতো সময়। প্রায় ৯৫ ঘণ্টা কম থাকা সত্ত্বেও তিনি কয়েক মাস নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদের ক্ষেত্রেও। তার লগবুকে একই উড্ডয়ন সময়কে একবার পাইলট ইন কমান্ড এবং আবার কো-পাইলট হিসেবে দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রায় ৩৫০ ঘণ্টা উড্ডয়ন সময়ের গরমিল ধরা পড়ে।
ক্যাপ্টেন আনিসের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় ২০০ ঘণ্টার বদলে মাত্র ১৬২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তবুও তাকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। আরেক পাইলট ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাবের নথিতে পাইলট ইন কমান্ড হিসেবে মাত্র ৩৩ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট উড্ডয়ন সময় থাকার কথা উল্লেখ ছিল। পরে জাল সনদের মাধ্যমে সেটিকে ১৫৫ ঘণ্টা দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া ক্যাপ্টেন নুরুদ্দিন আহমেদ, ইউসুফ মাহমুদ এবং মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা বাড়িয়ে দেখানো ও তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সমস্যা শুধু পাইলটদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। লাইসেন্স যাচাই ও তদারকি প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ফ্লাইট পরিদর্শকের বৈধ লাইসেন্স বা সাম্প্রতিক উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা না থাকলেও তারা পাইলট যাচাইয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে পুরো লাইসেন্সিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
বিমান চলাচল খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ছাড়া পাইলট দিয়ে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করলে জরুরি পরিস্থিতিতে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হতে পারে। এদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চিফ অব ফ্লাইট সেফটি হিসেবে ক্যাপ্টেন আহমেদ ইমরানের নিয়োগ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার বিরুদ্ধে অতীতে আচরণগত ও শৃঙ্খলাভঙ্গের কয়েকটি অভিযোগ উঠেছিল।
২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল করা একটি লিখিত অভিযোগে বলা হয়, তিনি নারী কেবিন ক্রু এবং ফার্স্ট অফিসারদের সঙ্গে আপত্তিকর আচরণ করেছেন। ককপিটে অশোভন ভাষা ব্যবহার এবং অনৈতিক মন্তব্যের অভিযোগও ছিল। এসব কারণে কয়েকজন নারী ক্রু তার সঙ্গে ফ্লাইট পরিচালনায় অনাগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন বলে জানা যায়। এ ছাড়া নিষিদ্ধ এপ্রন এলাকায় ধূমপান, স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) ভঙ্গ এবং ফ্লাইটের আগে অ্যালকোহল পরীক্ষায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোর মতো অভিযোগেও তাকে সতর্ক করা হয়েছিল বলে সূত্র জানিয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল বিধি অনুযায়ী, ফ্লাইট সেফটির প্রধান পদে নিয়োগ পেতে বিশেষায়িত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বিষয়ে সুস্পষ্ট দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, ক্যাপ্টেন ইমরান পূর্ণাঙ্গ কোনো বিশেষায়িত সেফটি কোর্স সম্পন্ন করেননি; কেবল কিছু সেমিনারে অংশ নিয়েছেন।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, জাল নথির মাধ্যমে কেউ পাইলটের দায়িত্ব পালন করলে তা যাত্রী নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। তাই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থা হিসেবেও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দায় রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ বলেন, অভিযোগ ওঠা লাইসেন্সগুলো তদন্ত করে যাচাই করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে ক্যাপ্টেন আহমেদ ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

