ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে পিটিয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জল নামের এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন মোড় এসেছে। আজ মঙ্গলবার (১০ মার্চ) দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানারের আদালত পুলিশের দেওয়া সম্পূরক চার্জশিট গ্রহণ করেছেন। একই সঙ্গে পলাতক ২২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক জিন্নাত আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, আদালত চার্জশিট গ্রহণের পর মামলাটি বিচারের জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. হান্নানুল ইসলাম ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর সম্পূরক চার্জশিট জমা দেন। আজ তার গ্রহণযোগ্যতা শুনানির জন্য আদালতে দিন ধার্য ছিল।
চার্জশিটে ২৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের মো. জালাল মিয়া (২৬), মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সুমন মিয়া (২১), পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মো. মোত্তাকিন সাকিন শাহ (২৪), ভূগোল বিভাগের আল হোসেন সাজ্জাদ (২৩), এবং ফজলুল হক মুসলিম হলের শিক্ষার্থী মো. আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ (২৪), ওয়াজিবুল আলম (২২), মো. ফিরোজ কবির (২৩), মো. আব্দুস সামাদ (২৪), মো. সাকিব রায়হান (২২), মো. ইয়াছিন আলী গাইন (২১), মো. ইয়ামুজ্জামান ওরফে ইয়াম (২২), মো. ফজলে রাব্বি (২৪), শাহরিয়ার কবির শোভন (২৪), মো. মেহেদী হাসান ইমরান (২৫), মো. রাতুল হাসান (২০), মো. সুলতান মিয়া (২৪), মো. নাসির উদ্দীন (২৩), মো. মোবাশ্বের বিল্লাহ (২৫), শিশির আহমেদ (২২), মো. মহসিন উদ্দিন ওরফে শাফি (২৩), আব্দুল্লাহিল কাফি (২১), শেখ রমজান আলী রকি (২৫), মো. রাশেদ কামাল অনিক (২৩), মো. মনিরুজ্জামান সোহাগ (২৪), মো. আবু রায়হান (২৩), রেদোয়ানুর রহমান পারভেজ (২৪), রাব্বিকুল রিয়াদ (২৩) ও মো. আশরাফ আলী মুন্সী (২৬)।
আদালতের নির্দেশে মো. আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ ও ওয়াজিবুল আলম জামিনে রয়েছেন। অন্যদিকে, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের মো. জালাল মিয়া, ভূগোল বিভাগের আল হোসেন সাজ্জাদ, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মো. মোত্তাকিন সাকিন শাহ ও মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সুমন মিয়া গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। বাকি ২২ জন পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা হান্নানুল ইসলাম জানান, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আগে অব্যাহতি পাওয়া আটজনসহ মোট ২৮ জনের বিরুদ্ধে পুনরায় তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এই ঘটনায় অন্য কাউকে আসামি হিসেবে পাওয়া যায়নি।
মামলার আগের প্রসঙ্গ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৮টার দিকে ফজলুল হক মুসলিম হলের গেটে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করছিলেন তোফাজ্জল। তাকে কয়েকজন শিক্ষার্থী আটক করে হলের গেস্টরুমে নিয়ে যান। মোবাইল চুরির অভিযোগে তাকে মারধর করা হয়। পরে ক্যান্টিনে খাওয়ানোর পরও আবার মারধরের ঘটনা ঘটে। শিক্ষকরা তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করলেও প্রথমে ব্যর্থ হন। রাত ১০টা ৫২ মিনিটে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
চার্জশিটে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার দিন তোফাজ্জল রাত ৭টা ৪০ মিনিটে হলের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করেন। তিন মিনিট ১৮ সেকেন্ড পর তিনি মাঠে পৌঁছান এবং ৫৭ সেকেন্ডের মধ্যে ছাত্ররা তাকে পিটতে শুরু করে। প্রায় ২৫ মিনিট জেরা ও মারধরের পর জানা যায়, তার মোবাইল চুরির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।
মামলার এজাহারে বলা হয়, পরে তাকে হলের দক্ষিণ ভবনের গেস্টরুমে নিয়ে জানালার সঙ্গে হাত বেঁধে স্টাম্প, হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়, যা তার মৃত্যুর কারণ হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর নিহতের ফুফাতো বোন মোসাম্মৎ আসমা আক্তার ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্টসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করার আবেদন করেন। আদালত বাদীর জবানবন্দি ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মামলা একত্রিত করে তদন্তের নির্দেশ দেন।

