মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিপাকে পড়েছেন হাজারো বাংলাদেশি প্রবাসী ও ওমরাহ যাত্রী। হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় কেউ দেশে ফিরতে পারছেন না, আবার অনেককে কয়েক গুণ বেশি দামে টিকিট কিনে দেশে ফিরতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সিডিএ কলোনির বাসিন্দা নিয়ামুল করিম গত চার বছর ধরে সৌদি আরবে চালক হিসেবে কাজ করছেন। ছয় মাস বয়সী ছেলেকে রেখে বিদেশে পাড়ি জমান তিনি। দীর্ঘদিন ছুটি না পাওয়ায় দেশে ফেরা হয়নি তার। অবশেষে দেশে ফেরার জন্য গত ২৬ ফেব্রুয়ারি এয়ার অ্যারাবিয়ার একটি টিকিট কাটেন তিনি। সৌদি আরবের আভা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শারজাহ হয়ে চট্টগ্রাম ফেরার জন্য তার টিকিটের দাম ছিল ৫৬০ রিয়াল, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ হাজার ৪৮০ টাকা। ফ্লাইটের তারিখ ছিল ৩ মার্চ।
কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে তার সেই ফ্লাইট বাতিল করে দেয় এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। বাধ্য হয়ে তিনি পরে সালাম এয়ারে নতুন টিকিট কাটেন। গত শনিবার কেনা সেই টিকিটের দাম পড়েছে ১ হাজার ৫৮০ রিয়াল, অর্থাৎ প্রায় ৫২ হাজার ১৪০ টাকা। মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে প্রায় তিন গুণ বেশি দামে টিকিট কিনে তাকে দেশে ফিরতে হয়েছে। সোমবার সালাম এয়ারের ফ্লাইটে চট্টগ্রাম ফেরার পথে বিমানে বসেই তিনি এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন।
শুধু নিয়ামুল করিমই নন, মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় একই ধরনের সংকটে পড়েছেন বহু প্রবাসী ও ওমরাহ যাত্রী। ফেনীর বাসিন্দা রাজ্জাক মোল্লা ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবের মক্কায় গিয়েছিলেন। ছয় দিন আটকে থাকার পর শেষ পর্যন্ত ৬২ হাজার টাকায় নতুন টিকিট কিনে দেশে ফিরতে হয়েছে তাকে।
রাজ্জাক মোল্লা জানান, তার দেশে ফেরার কথা ছিল ৩ মার্চ। কিন্তু এয়ার অ্যারাবিয়ার ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তাদের ১৪ জনের একটি দল আটকা পড়ে। পরে ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে আলোচনা করে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সোমবারের একটি ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হয়। নতুন টিকিটের জন্য তাকে মোট ৬২ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।
একই বিমানে দেশে ফেরা কুতুবদিয়ার বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল রাশেদ জানান, তিনি আট দিন সৌদি আরবে আটকে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত দেশ থেকে ৬০ হাজার টাকা পাঠানোর পর ট্রাভেল এজেন্সি তার জন্য টিকিটের ব্যবস্থা করে দেয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে টিকিটের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা বেশি নেওয়া হয়েছে বলে তাকে জানানো হয়।
এভাবে সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় আটকে পড়া অনেক ওমরাহ যাত্রী এবং প্রবাসীর কাছ থেকেই দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে রাতে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। কারণ রাতের সময়ই বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে। ফলে ওমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সৌদি আরবের জেদ্দা ও মদিনা বিমানবন্দরের আকাশে নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। গত সোমবার রাতে সালাম এয়ারের চট্টগ্রামগামী একটি উড়োজাহাজ নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে প্রায় আড়াই ঘণ্টা রানওয়েতে দাঁড়িয়ে ছিল।
চট্টগ্রামের একটি ট্রাভেল এজেন্সির মালিক দিদারুল ইসলাম জানান, বর্তমানে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরতে যাত্রীদের ৫৫ থেকে ৫৭ হাজার টাকায় টিকিট কিনতে হচ্ছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে একই টিকিট পাওয়া যেত ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকায়। বাংলাদেশ বিমান, ইউএস-বাংলা ও সালাম এয়ারসহ প্রায় সব এয়ারলাইন্সই বর্তমানে সাধারণ সময়ের তুলনায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেশি ভাড়া নিচ্ছে।
তিনি আরও জানান, আগে সালাম এয়ারে সৌদি আরব যাওয়া-আসার টিকিটের দাম ছিল ৮৫ থেকে ৮৭ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। সৌদি এয়ারলাইন্সের টিকিটও আগে যেখানে ১ লাখ ৫ হাজার টাকার মতো ছিল, এখন তা বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রামের আরেক ট্রাভেল এজেন্সি মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এয়ার অ্যারাবিয়া ও এমিরেটসসহ অনেক এয়ারলাইন্স ওমরাহ যাত্রী নিয়ে গেলেও ফ্লাইট বাতিল হওয়ার পর টিকিটের টাকা ফেরত নিয়ে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে চার্জ কেটে বাকি টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এতে যাত্রী ও ট্রাভেল এজেন্সির মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বাংলাদেশ থেকে হাজারো মানুষ ওমরাহ পালন করতে মক্কা ও মদিনায় গিয়েছিলেন। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অনেক এয়ারলাইন্স ফ্লাইট বাতিল করে দেয়। ফলে সৌদি আরবে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাংলাদেশি ওমরাহ যাত্রী আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছেন মক্কার বাংলাদেশ হজ মিশনের প্রধান কনসাল কামরুল ইসলাম।

