বৈশ্বিক উষ্ণতা দ্রুত বাড়তে থাকায় তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় ক্রমেই ওপরে উঠে আসছে বাংলাদেশ। নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাড়তে থাকা তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে ইতোমধ্যেই দেশের কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশের বড় অংশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চল ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সম্মিলিত প্রভাবে মানুষের বসবাসই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ: হেলথ’-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা দ্য ন্যাচার কনজারভ্যান্সি। এতে ১৯৫০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাত দশকের জলবায়ু তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণাটি এমন সময় প্রকাশিত হলো, যখন শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। ২০২৪ সালকে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবেও রেকর্ড করা হয়েছে। ওই বছরে বিশ্বজুড়ে ৪৩ শতাংশের বেশি তরুণ এবং প্রায় ৮০ শতাংশ বয়স্ক মানুষ এমন সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন, যখন তাপ ও আর্দ্রতার কারণে তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম সীমিত হয়ে পড়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশে বয়স্ক মানুষরা বছরে ২,৫০০ ঘণ্টারও বেশি সময় তীব্র তাপ ও আর্দ্রতার সম্মিলিত প্রভাবের মুখোমুখি হন। এই সময়ের মধ্যে নিরাপদে বাইরে শারীরিক শ্রম করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অথচ বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই সময়কাল ছিল প্রায় ২,১৮০ ঘণ্টা। অর্থাৎ অতীতের তুলনায় এখন বছরে প্রায় ৩৯০ ঘণ্টা বেশি সময় মানুষ তীব্র তাপের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না।
এর ফলে বছরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় বয়স্ক মানুষদের শারীরিক কাজ সীমিত রাখতে হচ্ছে। এমনকি দ্রুত হাঁটা বা সাধারণ গৃহস্থালি কাজের মতো দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডও অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সামান্য বেশি পরিশ্রম করলেই তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
গবেষকদের মতে, উচ্চ তাপমাত্রা, তীব্র আর্দ্রতা এবং ঘনবসতিপূর্ণ জনসংখ্যা—এই তিনটি কারণের সমন্বয় বাংলাদেশকে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে বয়স্ক মানুষরা বছরে ২,০০০ থেকে ২,৮০০ ঘণ্টা তীব্র তাপের কারণে দৈনন্দিন কাজকর্মে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছেন।
গবেষণায় মানবদেহ তাপের প্রতি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় তা বোঝার জন্য একটি শারীরবৃত্তীয় মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার যৌথ প্রভাব মানুষের শরীরের স্বাভাবিক শীতল থাকার ক্ষমতাকে দ্রুত অতিক্রম করতে পারে।
এদিকে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করেন, যেখানে বছরের সবচেয়ে গরম সময়গুলোতে তাপমাত্রা নিরাপদ শারীরিক কর্মকাণ্ডকে কঠোরভাবে সীমিত করে দেয়।
বিশেষ করে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বয়স্করা বছরে গড়ে প্রায় ৯০০ ঘণ্টা এমন তাপের মুখোমুখি হন, যখন নিরাপদে শারীরিক কাজ করা কঠিন। অথচ ১৯৫০-এর দশকে এই সময় ছিল প্রায় ৬০০ ঘণ্টা।
গবেষণার প্রধান লেখক ও জলবায়ুবিজ্ঞানী লুক পারসন্স বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে না, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবন নিরাপদভাবে পরিচালনার সময়ও কমিয়ে দিচ্ছে। এমনকি কিছু জায়গায় ছায়ার মধ্যেও সামান্য শারীরিক পরিশ্রম মানুষের শরীরের শীতল থাকার ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের কিছু অঞ্চল এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মাত্রা মানুষের বসবাসের জন্য অনুপযোগী হয়ে উঠবে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করেন যেখানে বছরের সবচেয়ে গরম সময়ে বয়স্কদের জন্য বিপজ্জনক তাপজনিত চাপ তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্দো-গঙ্গা সমভূমি, যার মধ্যে বাংলাদেশের বড় অংশ এবং ভারতের পূর্বাঞ্চল অন্তর্ভুক্ত, তাপজনিত ঝুঁকির দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল অঞ্চল। নিম্নভূমি ভূপ্রকৃতি, উচ্চ আর্দ্রতা এবং অত্যন্ত ঘন জনসংখ্যা এখানে তাপের প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জলবায়ুবিজ্ঞানী লুক পারসন্সের মতে, উন্নত দেশগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, কুলিং সেন্টার এবং উন্নত স্বাস্থ্য অবকাঠামোর কারণে মানুষ তুলনামূলক বেশি সুরক্ষা পায়। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এসব সুবিধা সীমিত হওয়ায় তাপপ্রবাহ মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর দ্রুত প্রভাব ফেলছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো কমানো না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে তীব্র তাপের কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ওপর সীমাবদ্ধতা আরও বাড়বে।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, বাংলাদেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দূষণ বড় ভূমিকা রাখছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শহরগুলো দ্রুত বিস্তৃত হলেও সঠিক পরিকল্পনার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তার মতে, তাপপ্রবাহের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, কুলিং সেন্টার স্থাপন, কর্মঘণ্টা পরিবর্তন এবং তাপ সহনশীল নগর পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।

