সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সরকারের নীতিগত সম্মতি থাকলেও দেশের আর্থিক চাপ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি ধীরে এবং সতর্কভাবে এগোনোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো চালুর বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও তা এখনো প্রস্তাব ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরকার এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করলেও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সরকারকে এই বিষয়ে ধীরগতির কৌশল নিতে বাধ্য করছে। এর ফলে নবম পে স্কেল কার্যকর হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের পক্ষ থেকে দ্রুত নতুন বেতন কাঠামো চালু করা এবং বিদ্যমান বেতন বৈষম্য দূর করার দাবি অব্যাহত রয়েছে। এদিকে পে স্কেল সংক্রান্ত প্রস্তাব আবারও পর্যালোচনা করার কথা জানিয়েছে সরকার। আসন্ন জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে কমিশনের সব সুপারিশ একসঙ্গে কার্যকর করা কঠিন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের একটি পরিকল্পনা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান এবং পে কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খান। যদিও সরকারি সূচিতে বৈঠকটি পিকেএসএফ চেয়ারম্যান হিসেবে দেখানো হয়েছিল, তবুও আলোচনায় পে কমিশনের প্রতিবেদন ও সুপারিশের বিষয়টিও উঠে আসে বলে জানা গেছে।
এর আগে ১৮ ফেব্রুয়ারি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, পে কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের আগে এর আর্থিক প্রভাব বিস্তারিতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, দেশের কর আদায় ও জিডিপির তুলনায় রাজস্ব সংগ্রহের হার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। তাই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে কত ব্যয় হবে এবং তা কতটা সম্ভব—এসব বিষয় বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে নবম পে স্কেল চালুর একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তা বাস্তবে কার্যকর হবে কিনা—এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়েই রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এই ঘাটতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণের জন্য একটি কমিশন গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নির্বাচনের আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। পরে কমিশন তাদের সুপারিশসহ প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সেই প্রতিবেদন পর্যালোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। নতুন বাজেট প্রণয়নের সময় বিষয়টি আবার আলোচনায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দায়িত্ব ছাড়ার আগে তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, পে কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবসম্মত। তবে এটি কার্যকর করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের ওপরই নির্ভর করবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৭ জুলাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রস্তাব তৈরির উদ্দেশ্যে ২১ সদস্যের একটি বেতন কমিশন গঠন করা হয়। সাবেক অর্থসচিব ও পিকেএসএফ চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খানকে ওই কমিশনের প্রধান করা হয়। ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা অনুযায়ী কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তাদের সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দেয়।

