রাহাদ সুমন, বরিশাল প্রতিবেদক
মাঠ কাঁপানো খ্যাতনামা ফুটবলার, সেনা কর্মকর্তা, ৭১’এর রণাঙ্গনের খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর পর এবার স্পিকারের পদ অলঙ্কৃত করলেন বৃহত্তর বরিশালের কৃতি সন্তান (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য এবং ভোলা–৩ আসনের সাতবারের সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বেলা ১১টায় অধিবেশন শুরু হলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাকে স্পিকার হিসেবে শপথ করান। শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠান জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে দুপুর ১২টার পর সম্পন্ন হয়। মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বর্তমানে নতুন সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও শিক্ষা
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের জন্ম ১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর ভোলার লালমোহনে। তার পিতা মরহুম ডা. আজহার উদ্দিন আহমদ ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় সংসদের সাবেক সদস্য এবং মা মরহুমা করিমুন নেছা বেগম গৃহিণী ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৬৪ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১ ডিসেম্বর ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন এবং ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অবসর গ্রহণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও সামরিক জীবন
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য তিনি বীরত্বসূচক রাষ্ট্রীয় খেতাব বীর বিক্রম পান। ৩১ জুলাই ১৯৭১ তিনি ১ম ইস্ট বেঙ্গলের কামালপুর বিওপি আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে আহত হন।
৩০ মার্চ ১৯৭১, যশোর ক্যান্টনমেন্টে তিনি তরুণ অফিসার হিসেবে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন এবং আট ঘণ্টাব্যাপী সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পরে যশোর-খুলনা অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করেন এবং বেনাপোল অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিনি ১ম ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের একমাত্র কমান্ডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিলেট দখলের সময়ে তাঁর নেতৃত্বে ‘বি’ কোম্পানি পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে।
রাজনৈতিক জীবন
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ভোলা-৩ (লালমোহন ও তজমুদ্দিন) আসন থেকে সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন (৩য়, ৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম, ৮ম ও ১৩তম সংসদ)। ১৯৯১ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদে জয়ী হন এবং ১৯৯২ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৯৬ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধিন দ্বিতীয় সরকারের তিনি বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী এবং ২০০১-০৬ সালে তৃতীয় সরকারের পানিসম্পদ, বাণিজ্য ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নতুন সরকারের তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

ক্রীড়াজীবন
তিনি ছিলেন খ্যাতনামা ফুটবলার। ১৯৬৭-১৯৭১ সালে পাকিস্তান জাতীয় দলের সদস্য হিসেবে ইরান, তুরস্ক ও বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) সফর করেন। ১৯৭০ সালে তেহরানে অনুষ্ঠিত আরসিডি প্রতিযোগিতায় তিনি জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন। ২০০৫ সালে ফিফা তাকে বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের সেরা ফুটবলার হিসেবে সেন্টেনারি অর্ডার অব মেরিট সম্মাননা প্রদান করে। তিনি ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং দলের সদস্য হিসেবে ১২ বছর খেলেছেন এবং ১৯৭৬ সালে দলের অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করেছেন।
তাছাড়া ১৯৬৪-৬৬ সালে প্রাদেশিক প্রতিযোগিতায় ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ে পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানবের খেতাব লাভ করেন।
পারিবারিক জীবন
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের স্ত্রী দিলারা হাফিজ ছিলেন শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত এবং ইডেন মহিলা কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা দপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে অবসর নেন। তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে— শাহরুখ হাফিজ, শামামা শাহরীন হাফিজ এবং তাহারাত হাফিজ।

