রাজধানীতে এক সেমিনারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তাঁর বক্তব্য, প্রস্তাবিত এই চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থের কোনো অগ্রাধিকার নেই। ফলে চুক্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিজয়নগরে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি কেন বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আনু মুহাম্মদ।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি আয়োজিত এই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রসুল। আলোচনায় অংশ নেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক মাহা মির্জা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা।
আনু মুহাম্মদ বলেন, বিএনপির নির্বাচনী স্লোগান ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। তাঁর মতে, যদি সত্যিই এই নীতি অনুসরণ করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রস্তাবিত বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উচিত চুক্তির বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া এবং যারা এতে জড়িত ছিলেন তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা।
চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের কিছু ব্যক্তির তৎপরতায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, প্রস্তাবিত চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে দেশের জন্য তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
আনু মুহাম্মদ আরও দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর মতে, চুক্তির বিভিন্ন শর্ত বাংলাদেশের আমদানি–রপ্তানি নীতি, শিল্পখাত এবং কর্মসংস্থানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু পণ্য আমদানি ও রপ্তানিতে বাধ্য করা হতে পারে। এতে দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে স্বাধীনতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আনু মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশকে তুলনামূলক বেশি শুল্ক দিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের বাণিজ্য সুবিধা দেয়নি। ফলে ওই বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়।
তিনি মনে করেন, জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এই চুক্তির বিষয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সব খাতের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার চুক্তি উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, সে সময় কিছু মানুষের মধ্যে চুক্তি করার ব্যাপারে অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো দেখা গিয়েছিল। তবে শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

