ইসলামী ব্যাংক আর কোনো দল, গোষ্ঠী বা পরিবারের প্রভাবের অধীনে পরিচালিত হবে না—এমন কঠোর বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, এখন থেকে ব্যাংকটি নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হতে হবে এবং কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব ধরনের সহযোগিতা দেবে বলেও জানান তিনি।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক–এর উদ্যোগে আয়োজিত এক বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন গভর্নর। সেখানেই তিনি ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দেন।
বৈঠকে গভর্নর বলেন, একসময় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড দেশের অন্যতম শক্তিশালী ও সুনামধন্য ব্যাংক ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুশাসনের ঘাটতি তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে আবারও ব্যাংকটিকে শক্ত ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা–এর সময় ব্যাংকটি একটি নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যে পড়ে যায়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন প্রভাবের কোনো সুযোগ নেই। এখন কোনো দল, গোষ্ঠী বা পরিবারের হয়ে কাজ করার পথ বন্ধ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে, সম্প্রতি চাকরিচ্যুত কয়েক হাজার কর্মকর্তা চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওই বিষয়টি বৈঠকের আলোচনায় আসেনি।
অন্যদিকে, ব্যাংকটির সঙ্গে যুক্ত বড় ঋণ বিতর্কও সামনে এসেছে। এস আলম গ্রুপ–কে ঘিরে করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রুপটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে বিপুল অর্থ পাচারের ঘটনাও ঘটেছে। এর মধ্যে শুধু ইসলামী ব্যাংক থেকেই নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ। প্রতিবেদনে গ্রুপটির কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদ–এর সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নানা বিতর্কের মধ্যেও ব্যাংকটির কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এস আলম গ্রুপের প্রভাবমুক্ত হওয়ার পর প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ব্যাংকটি প্রায় অর্ধ লাখ কোটি টাকার নতুন আমানত সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে।
২০২৫ সালের শেষে ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকায়। একই সঙ্গে প্রবাসী আয়, আমদানি–রফতানি বাণিজ্য এবং গ্রাহকসংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রেও কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা, ডিসেম্বর শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ১১৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ তিন মাসে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে এবং প্রভাবমুক্তভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হলে ইসলামী ব্যাংক আবারও আগের শক্ত অবস্থানে ফিরতে পারে।

