দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বাড়বাড়ন্ত এবার লভ্যাংশ বিতরণকে আটকে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের শ্রেণীকৃত ঋণ ১০ শতাংশ বা তার বেশি হলে সে যতোই মুনাফা করুক, সেই বছর লভ্যাংশ দিতে পারবে না।
গত হিসাব বছরের ডিসেম্বর শেষে সরকারি-বেসরকারি ২৯টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দুই অঙ্কে পৌঁছেছে। এটি মোট তপশিলি ব্যাংকের প্রায় অর্ধেক। বিশেষ করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১৭টি ব্যাংক এবার শুধু উচ্চ খেলাপির কারণে লভ্যাংশ দিতে পারবে না। এছাড়া মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতির কারণে গত বছর লভ্যাংশ বিতরণে ব্যর্থ ব্যাংকগুলোও একই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
এই বিধান চালু করা হয় গত বছরের ১৩ মার্চ, যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ড. আহসান এইচ মনসুর। শেয়ার প্রতিস্থাপনের বিপরীতে লভ্যাংশ ঘোষণার নীতিমালা মূলত ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে প্রবর্তিত হয়েছে। করোনার পর থেকে ২০২০ সাল থেকে ব্যাংকগুলোতে লভ্যাংশ বিতরণে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
নতুন নীতিমালায় শুধু প্রভিশন সংরক্ষণ নয়, ডেফারেল বা ঋণের অতিরিক্ত সময় নেয়ার ক্ষেত্রে লভ্যাংশ বিতরণে আরও শর্ত যুক্ত হয়েছে। এ অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক কেবল নিট মুনাফার উপর ভিত্তি করে নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে। পুঞ্জীভূত মুনাফা থেকে লভ্যাংশ দেওয়া যাবে না। এছাড়া, পরিশোধিত মূলধনের ৩০ শতাংশ বা নিট মুনাফার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশের মধ্যে লভ্যাংশ সীমাবদ্ধ থাকবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছে। গত সেপ্টেম্বর খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। তবে আদায় বৃদ্ধি ও বিশেষ পুনঃতপশিল সুবিধার কারণে ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমে পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায় নেমেছে, যা মোট ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ।
বর্তমানে দেশে ৬১টি তপশিলি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংক, যেখানে ১৭টি উচ্চ খেলাপির কারণে লভ্যাংশ দিতে পারবে না। সরকারি ৯টি ব্যাংকের মধ্যে কেবল রূপালী ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। ব্যাংকটির ১৯,৬৩১ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৪১.৫৮ শতাংশ খেলাপি। অন্য সরকারি ব্যাংকেরও খেলাপি ঋণ দুই অঙ্কের ওপর। সর্বোচ্চ জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৭৪ শতাংশ।
বেসরকারি খাতের খেলাপি ঋণেও চিত্র বিপর্যস্ত। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ৫টি ব্যাংকের ঋণ মিলিতভাবে খেলাপি সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের মোট ঋণের ৯৭.৬৪ শতাংশ খেলাপি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৬.৪৩ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৬.২৭ শতাংশ, এসআইবিএলের ৮০.৩৮ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৬২.৪৫ শতাংশ।
সমস্যাগ্রস্ত অন্যান্য ব্যাংকগুলোতে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ৮৪ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। আইএফআইসি ব্যাংকের ৫৩.১২ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৫১.৯৯ শতাংশ, এবি ব্যাংকের ৫০.৮৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার ৪৯.৩৪ শতাংশ, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৩০.৪৪ শতাংশ, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২২.৪৬ শতাংশ, এনআরবিসি ব্যাংকের ১৭.১১ শতাংশ।
এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো লভ্যাংশ বিতরণের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ এবং কর্মীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়াও কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় এসেছে। যদিও কিছু ব্যাংক শিথিলতা চেয়েছে, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি।

