গ্রামাঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলেছে এজেন্ট ব্যাংকিং। শহরে না গিয়েই এখন গ্রামের মানুষ সহজে টাকা জমা, উত্তোলন ও ঋণসহ নানা আর্থিক সেবা পাচ্ছেন। ফলে সময় ও খরচ—দুই-ই কমছে। এ কারণেই দিন দিন বাড়ছে এ সেবার জনপ্রিয়তা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে যেখানে আমানত ছিল ৪১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে ৭ হাজার ৫৭১ কোটি টাকার বেশি, যা ১৮ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি। শুধু শেষ তিন মাসেই আমানত বেড়েছে ২ হাজার ১৯ কোটি টাকার বেশি।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কম খরচে নতুন গ্রাহক যুক্ত করা এবং গ্রাম থেকে আমানত সংগ্রহের সুবিধার কারণে এজেন্ট ব্যাংকিং দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। ইসলামী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন শাখা খোলার তুলনায় এ পদ্ধতি অনেক সাশ্রয়ী এবং কার্যকর।
তবে আমানত বাড়লেও এজেন্ট ও আউটলেটের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে আউটলেট ছিল ২১ হাজার ২৪৮টি, যা ২০২৫ সালের শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫০১টিতে। একই সময়ে এজেন্টের সংখ্যা ১৬ হাজার ১৯টি থেকে কমে হয়েছে ১৫ হাজার ৩২৮টি। যদিও বছরের শেষ প্রান্তিকে আগের প্রান্তিকের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি দেখা গেছে।
গ্রাহকসংখ্যা কিন্তু উল্টো ধারায় বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট হিসাবধারী দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৫৮ লাখের বেশি। তিন মাসে নতুন হিসাব যুক্ত হয়েছে প্রায় ৭ লাখ। এর মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য—এক কোটির বেশি নারী এ সেবার আওতায় এসেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে গেছে। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য লেনদেন সহজ হচ্ছে।
অন্যদিকে, লেনদেনের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিকে যেখানে লেনদেন ছিল প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ, ২০২৫ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ কোটি ৬২ লাখে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ঋণ বিতরণেও দেখা গেছে ইতিবাচক প্রবণতা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৩১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বর শেষে বেড়ে হয়েছে ৩৫ হাজার ১৩ কোটি টাকার বেশি। তিন মাসে ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ১১২ কোটি টাকার বেশি।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। ২০১৪ সালে ব্যাংক এশিয়ার মাধ্যমে এ সেবার যাত্রা শুরু হয়। এখন এটি দেশের গ্রামাঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
গ্রামাঞ্চলেই এ সেবার সবচেয়ে বড় গ্রাহকভিত্তি গড়ে উঠেছে। মোট গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ২ কোটি ১৮ লাখ মানুষই গ্রামাঞ্চলের। এতে বোঝা যায়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে এজেন্ট ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আমানতের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, যার এজেন্ট ব্যাংকিং আমানত ২১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও ইউসিবি।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, আউটলেট ও এজেন্ট সংখ্যা কিছুটা কমলেও গ্রাহক, আমানত ও ঋণ—এই তিন সূচকে ইতিবাচক ধারা বজায় রয়েছে। ফলে এজেন্ট ব্যাংকিং এখন গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উঠে আসছে।

