দেশের ব্যাংকিং খাতের ভেতরে দীর্ঘদিন জমে থাকা অনিয়ম, রাজনৈতিক আশ্রয় ও কৃত্রিম হিসাবের পর্দা চলতি বছর ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করেছে। আর তাতেই সামনে এসেছে এক কঠিন বাস্তবতা। সরকারি ও শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি ব্যাংকগুলো এখন খেলাপি ঋণের ভারে কার্যত দিশেহারা অবস্থায় রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে সরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪৯ দশমিক ৬৫ শতাংশে। ইসলামি ব্যাংকগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ। সেখানে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে হয়েছে ৫৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। অর্থাৎ, এই দুই খাতে বিতরণ করা ঋণের অর্ধেকেরও বেশি এখন অনাদায়ি। তুলনামূলকভাবে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৪১ দশমিক ৯৫ শতাংশ। আর বিদেশি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে তা মাত্র ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শরিয়াহভিত্তিক ১০টি ইসলামি ব্যাংক মোট ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা ঋণ বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১০ টাকার প্রায় ৬ টাকাই এখন আদায় অনিশ্চিত। অন্যদিকে শরিয়াহসহ দেশীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৬৩ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। যা তাদের মোট ঋণের ৩৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এই তুলনাই স্পষ্ট করে, খেলাপির বোঝা সবচেয়ে বেশি ইসলামি ব্যাংকগুলোর ঘাড়েই।
সরকারি ছয় ব্যাংকের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় অর্ধেকই সেখানে অনাদায়ি হয়ে আছে। ব্যাংকার ও বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি ঋণ আড়াল করার প্রবণতাই ব্যাংকগুলোকে এই অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, খেলাপি ঋণের এত উচ্চ হার শুধু ব্যাংকিং খাতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। এটি পুরো অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে পারছে না। বিনিয়োগ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ছে। শিল্প ও কারখানার সম্প্রসারণ থেমে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। তাঁর মতে, খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ঋণ আদায়ে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
ইসলামি ব্যাংকিং খাতে এস আলম, নাসা ও বেক্সিমকো গ্রুপের নাম বারবার উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন সরকারি মদদে এসব গ্রুপ বিপুল অঙ্কের ঋণ নিলেও খেলাপি হিসেবে তা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। এখন সেই বাস্তবতা প্রকাশ্যে এসেছে।
সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, বিগত সরকারের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর যে অপচেষ্টা ছিল, তা এখন ভেঙে পড়েছে। সঠিক হিসাব সামনে আসায় খেলাপির হার ৩৬ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এটি বাস্তবতারই প্রতিফলন। তিনি শীর্ষ ১০ খেলাপির জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও আবার তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, আগের সরকারের সময় লুকিয়ে রাখা খেলাপি ঋণ প্রকাশ পাওয়ায় এই হার বেড়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন ঋণ আদায়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। এর ফলে আগের তুলনায় আদায় বাড়ছে বলেও জানান তিনি।

