বিভিন্ন আর্থিক জালিয়াতির কারণে ব্যাংক খাতের সংকটের বিষয়টি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের অনেক আগেই আলোচনায় আসে। তখন ব্যাংক সংস্কারের কথা বলা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং ঋণ পুনঃতপশিলসহ নানা ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণ আড়াল করার সুযোগ তৈরি করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকই।
মালিকপক্ষের অর্থ আত্মসাতের কারণে কয়েকটি ব্যাংক চরম দুরবস্থায় পড়লেও তখন কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো বিশেষ ধার হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট থেকে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর লুকানো খেলাপি ঋণ সামনে আসতে শুরু করে। এতে খেলাপি ঋণের অঙ্ক কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ২০২৫ সালজুড়ে প্রতি প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়টি ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
একই সঙ্গে আলোচনায় আসে দুর্দশাগ্রস্ত পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করে। ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে যেসব ব্যাংকের মালিকপক্ষ অর্থ আত্মসাৎ করেছে, সেগুলো একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এর অংশ হিসেবে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা হয় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। এসব ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক দুটি অডিট ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হয়।
এরপর গত এপ্রিলে সরকার জারি করে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ–২০২৫। সেই আইনের আওতায় পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়। আরও কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়াও চলছে। এ লক্ষ্যে এবি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান যাচাই করা হচ্ছে।
একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে ৭৬ লাখ আমানতকারীর প্রায় এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। এর বিপরীতে ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। এসব ঋণের গড়ে ৭৭ শতাংশই খেলাপি। আমানতকারীদের প্রথম ধাপে আমানত বীমা তহবিল থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। বাকি অর্থও পর্যায়ক্রমে তোলার সুযোগ থাকবে।
তবে এসব ব্যাংকসহ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের আমানত আদৌ পুরোপুরি তোলা যাবে কি না, তা নিয়েও বছরজুড়ে আলোচনা চলেছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের মধ্যে শেয়ার হিসেবে দেওয়া হবে।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে ব্যাপক অনিয়মের কারণে তা বাড়তে থাকে। খেলাপি ঋণ কমাতে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে ২০১৩ সাল থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় পুনঃতপশিল ও পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়।
করোনাভাইরাসের প্রভাব দেখিয়ে কোনো ঋণ পরিশোধ না করেও খেলাপিমুক্ত থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে ২০২৪ সালের আগস্টের পর প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করতে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়ে গত সেপ্টেম্বর শেষে দাঁড়ায় ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি শুরুর পর ২০২৩ সালে কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। এতে ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ দেখানো হয় দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। যা তখন মোট ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ ছিল। পরে গত বছরের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় তিন লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। প্রতি প্রান্তিকে এই ঊর্ধ্বগতি নিয়েই চলেছে আলোচনা।
স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠনের লক্ষ্যে বিদায়ী বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গভর্নরকে মন্ত্রী পদমর্যাদা দেওয়া এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শুধু সংসদের কাছে দায়বদ্ধ করার প্রস্তাব ছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার এখনো সংশোধন হয়নি।
এ ছাড়া ব্যাংকের ওপর পারিবারিক প্রভাব কমাতে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হলেও অগ্রগতি হয়নি। খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের প্রস্তাবিত আইনও এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।

