দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যাংকিং কেলেংকারির প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনেও (বিপিসি)। বিগত সময়ে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ছয় ব্যাংকে জমানো দুই হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত নিয়ে কিছুটা বেকায়দায় পড়েছিল সরকারি প্রতিষ্ঠানটি।
তবে সম্প্রতি চারটি ব্যাংক অবসায়ন হয়ে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক হিসেবে গঠিত হওয়ায় বিপিসি জানিয়েছে, এই দুশ্চিন্তা কিছুটা কমেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংকিং সেক্টরে বড় লুটপাটের তথ্য প্রকাশ্যে আসে। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন সাতটি ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটিতে ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে গত দেড় বছরে সারাদেশে তুমুল সমালোচনা হয়। ওই পাঁচ ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এসব ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতি নিয়ে বেশ কয়েকটি মামলা করেছে। আরও কিছু মামলা প্রক্রিয়াধীন বলে জানায় দুদক সূত্র।
বিপিসির ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) এটিএম সেলিম জানিয়েছেন, “এস আলম সংশ্লিষ্ট ছয়টি ব্যাংকে বিপিসির আমানত রয়েছে। এর মধ্যে চারটি ব্যাংক অবসায়িত হয়েছে। পাশাপাশি অবসায়িত এক্সিম ব্যাংকেও আমাদের আমানত রয়েছে। এসব আমানত বিভিন্ন সময়ে রাখা হয়েছিল। যথাযথ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও নির্দেশনা অনুসারে ব্যাংকগুলোতে অর্থ জমা রাখা হয়েছিল।”
এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো হলো—ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। এছাড়া কমার্স ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকেও গ্রুপটির নিয়ন্ত্রণ থাকলেও ওই দুই ব্যাংকে জালিয়াতির তথ্য পাওয়া যায়নি। ইসলামী ব্যাংক বাদে অন্য চারটি ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বিলুপ্ত করা হয়েছে। অবসায়িত পাঁচ ব্যাংক নিয়ে সরকারি মালিকানায় গঠিত হয়েছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’, যার কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
বিপিসির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছয় ব্যাংকে এফডিআর ও এসএনডি মিলিয়ে বিপিসির আমানত দুই হাজার ৭০ কোটি টাকার বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে জমা বেড়েছে ৭২৫ কোটি টাকা। জমার বড় অংশই ইসলামী ব্যাংকে।
নিরীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে বিপিসির জমা ৮৭৪ কোটি ৯৬ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৩ টাকা। আগের অর্থবছরে একই সময়ে ছিল ২০৯ কোটি ৩৭ লাখ ৪০ হাজার ৮৪৬ টাকা। এক বছরে জমা বেড়েছে ৬৬৫ কোটি ৫৯ লাখ ২৬ হাজার ৬৩৭ টাকা।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে জমা ছিল ৭২৮ কোটি ৫০ লাখ ৭৪ হাজার ১৮৯ টাকা, যা আগের অর্থবছরে ৭০০ কোটি ৯৬ লাখ ১৬ হাজার ৪৭৩ টাকা ছিল। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে জমা ২১২ কোটি ১৮ লাখ ৫৬ হাজার ৩৮৩ টাকা, যা আগের অর্থবছরে ১৬ কোটি ৪৬ লাখ ৪৯ হাজার ১৩৪ টাকা কম। ইউনিয়ন ব্যাংকে জমা ছিল ২২২ কোটি ৫ লাখ ৭০ হাজার ৭২৩ টাকা, আগের অর্থবছরে ২০৬ কোটি ৫১ লাখ ১৫ হাজার ৪১২ টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে জমা ছিল ১০ কোটি টাকা, আগের অর্থবছরে ১১ কোটি ৪৮ লাখ ৬৬৪ টাকা। কমার্স ব্যাংকে জমা ২২ কোটি ৩৩ লাখ ৫ হাজার ৩৫১ টাকা।
অবসায়িত চার ব্যাংকে বিপিসির জমা ১ হাজার ১৭২ কোটি ৭৫ লাখ ১ হাজার ২৯৫ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসব ব্যাংক নিয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে হিসাবগুলো ট্রান্সফার করা হচ্ছে। এক্সিম ব্যাংকে বিপিসির জমা ১৫৩ কোটি ২৬ লাখ ৮৭ হাজার ২৫৪ টাকা এবং সমস্যাগ্রস্ত ন্যাশনাল ব্যাংকে ১৪২ কোটি ৫৬ লাখ ৪৫ হাজার ১৮১ টাকা রয়েছে।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকে আমানত থাকলেও নিয়মিত এলসি পরিচালনার কারণে আপাতত কোনো সমস্যা নেই। অবসায়িত ব্যাংকগুলোর আমানত নিয়েও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে। “এখন অবসায়িত ব্যাংকগুলো নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হওয়ায় এবং এটি সরকারি মালিকানার ব্যাংক হওয়ায় বিপিসির আমানত নিরাপদ। আপাতত দুশ্চিন্তা নেই,” বলেছে এটিএম সেলিম।

