বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “সোনার তরী” কবিতায় অসহায় কৃষকের কাছে নৌকা ঠিকই আসে। কৃষকের কষ্টে ফলানো ধান নৌকায় তোলা হয় থরে বিথরে। ঢেউয়ের তালে পাল তুলে নৌকা ছুটে যায় গন্তব্যে। কিন্তু নৌকায় ঠাঁই হয় না কৃষকের। সব উপার্জন হারিয়ে নদীতীরে দাঁড়িয়ে থাকে সে। আক্ষেপে উচ্চারণ করে—‘শূন্য নদীর তীরে,রহিনু পড়ি—যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।’
রবীন্দ্রনাথের নৌকায় কৃষকের জায়গা না মিললেও, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কুবের মাঝির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হয়নি। “পদ্মা নদীর মাঝি” উপন্যাসে কেতুপুরের বাসিন্দা কুবের মাঝি দারিদ্র্য আর সংকটের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। তার সামনে মুক্ত জীবনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে অপেক্ষা করে ময়নাদ্বীপ। সেই ময়নাদ্বীপে যাওয়ার নৌকায় শেষ পর্যন্ত স্বাগত জানানো হয় কুবের মাঝিকে।
এই সাহিত্যিক রূপকের মতোই অর্থনীতির সাগরেও সাম্প্রতিক সময়ে ঢেউ তুলেছে একীভূতকরণ বা মার্জার এবং অধিগ্রহণ বা অ্যাক্যুইজিশন। কোথাও ডুবতে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানকে কিনে আরেকটি প্রতিষ্ঠান বড় শক্তিতে রূপ নিয়েছে। আবার কোথাও অতিমুনাফার আশায় একের পর এক অধিগ্রহণ শেষ পর্যন্ত নিজেকেই ভাসাতে পারেনি। ভেঙে পড়েছে নৌকার মতো।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের একীভূতকরণ এমনই এক নতুন ঢেউ সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন শঙ্কা ও উৎকণ্ঠায় থাকা এসব ব্যাংকের আমানতকারী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শেয়ারধারীদের সামনে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে। একীভূত হয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক তাদের কাছে আশার নৌকা হয়ে হাজির হয়েছে।
এই একীভূতকরণ শুধু একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছ পরিচালনা নিশ্চিত করা গেলে এই নৌকা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। বিশ্ব বাণিজ্যের মাঠে মার্জার এখন দাবার ঘুঁটির মতো। সঠিক চাল হলে বাজিমাত। ভুল হলে পুরো খেলায় কুপোকাত হওয়ার ঝুঁকি। সেই ঝুঁকি মাথায় নিয়েই ‘মার্জার অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন গেইমে’ পুরোদস্তুর খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছেন উচ্চাভিলাষী প্রধান নির্বাহীরা।
তবে এই উন্মাদনা সব সময় এক রকম ছিল না। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক সংঘাত, রাজনৈতিক আগ্রাসন এবং বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির পরিবর্তনের প্রভাবে ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর বিশ্বজুড়ে অধিগ্রহণ কার্যক্রম কিছুটা শীতল ছিল। যুক্তরাজ্যভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বেইন অ্যান্ড কোম্পানির প্রকাশিত গ্লোবাল মার্জার অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন রিপোর্ট–২০২৫-এ এই চিত্রই উঠে এসেছে।
ওই সময় স্থিতিশীল বাজারের অপেক্ষায় ছিলেন বিনিয়োগকারী ও করপোরেট কারবারিরা। কিন্তু ২০২৫ সালে পরিস্থিতি বদলে যায়। অধিগ্রহণ কার্যক্রম নতুন গতি পায়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত অন্তত ১০টি সোমবার শুরু হয়েছে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের কোম্পানি মার্জারের খবরে। এই প্রবণতার কারণে ব্রিটিশ সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট এক প্রতিবেদনে সোমবারকে আখ্যা দিয়েছে ‘মার্জার মানডে’। বিশ্ববাজারে বড় অঙ্কের চুক্তি যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
আর্থিক ও বাণিজ্যিক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) এক জরিপে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ৬৩টি বৃহৎ মার্জার চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিটি চুক্তির মূল্য ছিল ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এই ৬৩টি চুক্তির মধ্যে ৩২টি কর্পোরেট মেগাডিলেই লেনদেন হয়েছে প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আস্থার ফেরার ইঙ্গিত হিসেবেই এই মার্জার ঢেউকে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন কোম্পানির প্রধান নির্বাহীরা এখন মার্জার ও অধিগ্রহণের ডিল নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধে নেমেছেন। কে আগে কাকে কিনবে, সেই প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক করপোরেট অঙ্গনে।
এই প্রতিযোগিতার বড় উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের রেলপথ খাত। আমেরিকার রেল রোড কোম্পানি ইউনিয়ন প্যাসিফিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে আরেক মার্কিন প্রতিষ্ঠান নরফোল্ক সাউদার্ন অধিগ্রহণ করেছে। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম মেগাডিল। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ মেগাডিল হয়েছিল ২০১৯ সালে। সে বছর ৯০ বিলিয়ন ডলারে প্রতিরক্ষা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রায়থিওন কিনেছিল ইউনাইটেড টেকনোলজিসকে। বিনোদন খাতেও মার্জার যুদ্ধ কম নয়। ওয়ার্নার ব্রোস ডিসকোভারি ৬০ বিলিয়ন ডলারে কিনতে নেটফ্লিক্স, কোমকাস্ট ও প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের মধ্যে শুরু হয় তীব্র দরকষাকষি। বড় অঙ্কের এই ডিল ঘিরে করপোরেট বোর্ডরুমে চলে বাজির টেবিলে চাপড়ানোর মতো উত্তেজনা।
প্রযুক্তি খাতেও একই চিত্র। স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের স্থাপিত ‘মার্জার অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন ইউনিট’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিগ্রহণ কৌশল সাজিয়েছে। এই কৌশলের মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্টকে ৭৪ বিলিয়ন ডলারের মেগাডিলের প্রতিযোগিতায় পরাজিত করা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, মার্জার নিয়ে কেন এত মাতামাতি ও দরকষাকষি। বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মুনাফার প্রত্যাশা, স্বল্প সুদের সুবিধা এবং নতুন বাজারে দ্রুত প্রবেশের সুযোগই উচ্চাভিলাষী সিইওদের বড় ডিলে ঝুঁকতে উৎসাহিত করছে। কিন্তু অধিগ্রহণ করলেই কি নিশ্চিতভাবে বিশাল মুনাফা আসে। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ক্লেটন ক্রিস্টেনসেন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন গবেষণায়। তিনি ২০০০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মার্জার ও অধিগ্রহণ নিয়ে বিশ্লেষণ করেন। গবেষণায় দেখা যায়, ওই সময় অধিগ্রহণ করা ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ কোম্পানি মুনাফার লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ সফল হয়েছে মাত্র ১০ থেকে ৩০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান।
এই তথ্যই দেখাচ্ছে, মার্জার ও অধিগ্রহণ যতটা সুযোগ তৈরি করে, ততটাই ঝুঁকির খেলাও বটে। তবে যুদ্ধে কেউ হারতে চায় না। বাণিজ্যিক যুদ্ধে তো নয়ই। সেই লড়াইয়ে বাজির টেবিলে অনেকে সর্বস্ব হারাতেও পিছপা হন না। তাই মার্জার ও অধিগ্রহণের মেগাডিল থেমে থাকেনি।
ব্যর্থতার কারণ খতিয়ে দেখতে হয়েছে বিস্তর গবেষণা। ক্লেটন ক্রিস্টেনসেনের সতর্কবার্তা প্রকাশের পর কেটে গেছে দেড় দশকের বেশি সময়। এই সময়ে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন কনসালটেন্সি ফার্ম। সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি ও তথ্য বিশ্লেষণ। কালীপ্রসন্ন ঘোষের ‘একবারে না পারিলে দেখ শতবার’ মন্ত্রে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মার্জার ঢেউ আরও জোরালো হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মূল্যের মার্জারের ভাগ্যে কী আছে। রবীন্দ্রনাথের নৌকার মতো সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কি ফসল তুলে নিয়ে শূন্যে মিলিয়ে যাবে, নাকি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কুবের মাঝির মতো সংকট থেকে উদ্ধার করে ময়নাদ্বীপে পৌঁছে দেবে।
এই মার্জারের ফলে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য আপাতত একটি সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে। তবে অন্য অংশীজনদের জন্য অপেক্ষা রয়ে গেছে অনিশ্চিত। তবু প্রত্যাশা, দেশের এই ঐতিহাসিক মেগাডিল সফল হয়ে সমৃদ্ধির নতুন গল্পের জন্ম দেবে। মেগাডিলে যুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা পরবর্তী পাঁচ বছরে কোথায় দাঁড়ায়, তা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে ব্রিটিশ সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট। পত্রিকাটির ব্যবসা, কৌশল, উদ্ভাবন এবং একীভূত ও অধিগ্রহণ বিষয়ক কলাম ‘শুমপিটার’-এ এ নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
ওই নিবন্ধে ২০১০ সাল থেকে ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যে সম্পন্ন হওয়া ১১৭টি মেগাডিলের আর্থিক চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব মেগাডিলে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্জারের পরবর্তী পাঁচ বছরে এসব কোম্পানির মধ্যমমানের ডিলে মুনাফা বেড়েছে বছরে ৬ শতাংশ হারে। তবে একই সময়ে মূলধনের বিপরীতে আয় কমেছে ২ শতাংশ হারে।
শুমপিটার কলামে আরও বলা হয়েছে, এই মেগাডিলের খেলায় অর্ধেক বাজিকর লাভবান হয়েছেন। বাকি অর্ধেক পড়েছেন লোকসানে। যারা ভালো করতে পেরেছেন, তারা পরবর্তী পাঁচ বছরে তাদের মূলধন ২ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অন্য অর্ধেক কোম্পানি পিছিয়ে পড়ে। তাদের শেয়ারমূল্য কমে গেছে ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এই চিত্রই দেখাচ্ছে, মার্জার ও অধিগ্রহণের খেলায় জয় আর পরাজয়ের ব্যবধান খুবই সূক্ষ্ম।
কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান বেইন অ্যান্ড কোম্পানির এক জরিপে দেখা গেছে, ২০১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত যেসব কোম্পানি বছরে অন্তত একটি করে অধিগ্রহণ করেছে, তাদের আয় গড়ে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। বিপরীতে অধিগ্রহণে অনাগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে। তবে এই আয় বৃদ্ধির পেছনে শুধু অধিগ্রহণই একমাত্র কারণ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অধিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা, সক্ষমতা বাড়িয়ে নতুন বাজারে প্রবেশ এবং ঝুঁকিপূর্ণ বড় প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণের বদলে ছোট ছোট একাধিক প্রতিষ্ঠান কেনার কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
একই সঙ্গে বদলেছে ব্যবসার ধরন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের মাধ্যমে খরচ কমিয়ে মুনাফা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে কোম্পানিগুলোর মেগাডিলে অংশ নেওয়ার সক্ষমতাও বেড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব খাতের বাইরে ভিন্ন খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণের ঝুঁকি নেওয়ার দক্ষতাও অর্জন করেছে। তবে এত কৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহারের পরও সর্বশেষ জরিপে দেখা যায়, অর্ধেক কোম্পানি এখনও মুনাফা করতে পারেনি। বরং তারা মূলধন হারিয়েছে। অর্থাৎ মার্জার কারবারে হার-জিতের ঝুঁকি এখনও ৫০–৫০।
মার্জার নিয়ে বৈশ্বিক এই উন্মাদনার ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশেও। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা মূল্যের মেগামার্জারের মাধ্যমে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক।
এই পাঁচ ব্যাংক হলো এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। এর আগে দেশে ২০০৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৮ বছরে মোট ২২টি মার্জার হয়েছে। এসব মার্জারের সম্মিলিত মূল্য ছিল ২ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। মার্জার সংক্রান্ত এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে ইডিজিই রিসার্চ অ্যান্ড কনসাল্টিং লিমিটেড এবং লাইটক্যাসেল পার্টনার্সের যৌথ এক গবেষণা প্রতিবেদনে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ডিলগুলোর মধ্যে এককভাবে সর্বোচ্চ ১.৪৭ বিলিয়ন ডলারের ডিল হয়েছিল ২০১৮ সালে। জাপান টোব্যাকো সেই বছর আকিজ গ্রুপের তামাক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে এই রেকর্ড স্থাপন করে।
আলোচ্য সময়ে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সক্রিয় ছিল। ১২৫ মিলিয়ন ডলারের দুটি মার্জার ডিল সম্পন্ন হয়েছে। ২০০৮ সালে আইসিবি ফাইন্যানশিয়াল গ্রুপ ওরিয়েন্টাল ব্যাংক অধিগ্রহণ করে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক গঠন করে। ২০০৯ সালে ইকুইটি পার্টনার লিমিটেড (ইপিএল) অধিগ্রহণ করে ব্র্যাক ব্যাংক গঠন করে। ২০১৬ সালে ১২.৮০ মিলিয়ন ডলারের লেনদেনে রবি ও এয়ারটেল একীভূত হয়ে রবি নামের কার্যক্রম শুরু করে।
স্বাধীনতার পর দেশের ছয়টি সরকারি ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয় ১২টি ব্যাংক মার্জারের মাধ্যমে। এরপর ২০০৯ সালে সরকারি খাতের বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক ও বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা একীভূত করে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) গঠন করা হয়। তবে ওই ব্যাংক সংকট কাটিয়ে সফলতার মুখ দেখতে পারেনি।
সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪ সালে ব্যাংক এশিয়া পাকিস্তানি ব্যাংক আল ফালাহকে ৪৮.৭৮ মিলিয়ন ডলারে বা প্রায় ৬০০ কোটি টাকায় অধিগ্রহণ করে। চলতি বছরে আকিজ গ্রুপ জনতা-সাদাত জুট মিলকে ৫৮.৯৪ মিলিয়ন ডলারে বা প্রায় ৭২৫ কোটি টাকায় কিনে নেয়।
বিশ্বে দেখা যায়, একটি জায়ান্ট কোম্পানি অন্য কোম্পানি অধিগ্রহণ করে শক্তিশালী হয়। দেশের প্রেক্ষাপটেও একই ধারা দেখা গেছে। এক ভালো কোম্পানি সাধারণত দুর্বল বা ছোট প্রতিষ্ঠানকে অধিগ্রহণ করে।
কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটেছে ৫ ইসলামী ব্যাংকের মার্জারে। এই পাঁচটি রুগ্ন প্রতিষ্ঠান একত্রিত করে একটি বড় মূলধনি কোম্পানি, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক, গঠন করা হয়েছে। এই ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের মধ্যে ৭৬ শতাংশই খেলাপি ঋণ। ৭৫ লাখ আমানতকারী সর্বমোট ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এছাড়া ১০ টাকার অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারকে শুন্য ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাহাড়সম খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, প্রভিশন ঘাটতি এবং বিপুল অঙ্কের লোকসান—সব মিলিয়ে রুগ্ন ব্যাংকগুলোর এই একীভূতকরণ কতটা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবে, তা কিছুটা হলেও উত্তর দেয় বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের উদাহরণ।
দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মূল্যের মার্জারের ভাগ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথের নৌকার মতো কি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ফসল তুলে শূন্যে মিলিয়ে যাবে, নাকি বিপদগ্রস্ত কুবের মাঝির মতো সংকট কাটিয়ে ময়নাদ্বীপে পৌঁছাবে। এই মার্জারের ফলে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য আপাতত সমাধান পাওয়া গেলেও বাকিদের জন্য অপেক্ষা রয়ে গেছে অনিশ্চিত। তবে প্রত্যাশা, দেশের এই ঐতিহাসিক মেগাডিল সফল হয়ে সমৃদ্ধির নতুন গল্পের অংশ হোক।

