নতুন বছরে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সঠিক নীতি সহায়তার মাধ্যমে সমস্যায় জর্জরিত ব্যাংক খাত ঘুরে দাঁড়াবে—এমন আশাবাদ জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ ব্যাংকাররা। তাঁদের মতে, নীতির ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকিং খাতেও গতি ফিরবে।
বাংলাদেশে সদ্য বিদায়ী ২০২৫ সাল ছিল ঘটনাবহুল। তবে ব্যাংক খাতের জন্য বছরটি ছিল সবচেয়ে কঠিন সময়ের একটি। এর পেছনে বড় কারণ ছিল আগের সরকারের সময়কার অব্যবস্থাপনা এবং ভুল খাতে ঋণ বিতরণের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব।
বছরজুড়ে অর্থনৈতিক ধীরগতি ব্যাংকিং কার্যক্রমে চাপ তৈরি করে। উচ্চ সুদের হারের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যায়। এর পাশাপাশি কয়েকটি অনিয়মকারী ব্যাংকে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়। অনেকেই টাকা তুলে নিতে শুরু করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
এই প্রেক্ষাপটে সারা বছরই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিট ইন্টারেস্ট মার্জিন বা এনআইএম সংকুচিত হতে থাকে। মুনাফার সুযোগ কমে যায়। অনেক ব্যাংক সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করে কোনোমতে আয় ধরে রাখে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন ঘিরে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিদায়ী বছরটি ব্যাংকগুলোর জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। তাঁর মতে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াবে। তবে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট পুরোপুরি কাটবে না। তিনি বলেন, সামনে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়বে। কিন্তু সরকার যদি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ধার নেওয়া অব্যাহত রাখে, তাহলে ব্যাংকগুলোর ওপর তারল্য চাপ আরও বাড়তে পারে। এ কারণে সরকারি অর্থায়নে ভারসাম্য আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর পরামর্শ, ব্যাংকের ওপর চাপ কমাতে রাজস্ব আহরণে সরকারকে আরও জোর দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.২৩ শতাংশে। গত দুই দশকের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। মুনাফা প্রসঙ্গে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে ব্যবসা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর এনআইএম নিম্নমুখী। সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করেই মূলত ব্যাংকগুলো কিছুটা আয় করছে। তিনি আরও জানান, ব্যাংকিং খাত সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২ ও ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধন এখনো অনুমোদন পায়নি। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে তিনি বলেন, সুশাসন নিশ্চিত করতে এসব সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।
পূবালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী তুলনামূলকভাবে বেশি আশাবাদী। তিনি মনে করেন, চলতি পঞ্জিকাবর্ষে ব্যাংক খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তাঁর ভাষায়, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর একটি রাজনৈতিক সরকার অর্থনীতির দায়িত্ব নেবে। এতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি হবে। এই স্থিতিশীলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ বজায় রাখতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তারল্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়লে বেসরকারি খাত ঋণবঞ্চিত হওয়ার যে আশঙ্কা রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনে বাজারে তারল্য সরবরাহ করছে। তাই বড় ধরনের ‘ক্রাউডিং আউট’ পরিস্থিতি তৈরি হবে না বলে তাঁর ধারণা।
মোহাম্মদ আলী আশা প্রকাশ করেন, আগামী দিনে ঋণের সুদের হার ১২ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ জুলাই থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বিনিময়ে মোট ৩.১৪ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। খেলাপি ঋণ নিয়ে তিনি বলেন, ডিসেম্বরের শ্রেণিকৃত ঋণের তথ্য প্রকাশ হলে দেখা যাবে বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মো. তৌহিদুল আলম খান বলেন, ২০২৬ সালের দিকে তাকালে বোঝা যায় ব্যাংক খাত একটি বড় রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে। বিশেষ করে নতুন সরকার গঠনের সম্ভাবনা এই সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি মনে করেন, এটি আর্থিক সুশাসনের নতুন অধ্যায় শুরু করার বিরল সুযোগ। রাজনৈতিক সংযোগের বদলে যোগ্য পেশাদারদের দ্বারা পরিচালিত এবং জনআস্থার ওপর দাঁড়ানো একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
তবে তাঁর মতে, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে শুধু নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা যথেষ্ট নয়। এর জন্য মানসিকতার মৌলিক পরিবর্তন দরকার। নীতিনির্ধারকদের আর্থিকভাবে স্বাধীন ব্যাংক খাতের গুরুত্ব বুঝতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকারদের নিজেদের অর্থনৈতিক সততার রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষ জনবল দিয়ে গড়া ফরেনসিক অডিট ব্যবস্থা, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রক্রিয়া এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কাঠামো একীভূত করা গেলে জবাবদিহিতা অনেক বাড়বে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আইএফআরএস-৯ অনুসারে ‘এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস’ মডেল চালুর পরামর্শও দেন তিনি। এতে খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও জোরালো হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধান বলেন, সামনে ধুঁকতে থাকা অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্যাংকগুলোর ওপর তারল্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই নীতি সহায়তা জরুরি। তিনি জানান, এই সহায়তার আওতায় ব্যবসায়ীদের দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হতে পারে। এ সময়ে ব্যাংকগুলো ঋণের কিস্তি পাবে না। কিন্তু আমানতকারীদের সুদ পরিশোধ করতে হবে। এতে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়বে।
ওই ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ২০২৫ সাল ছিল ব্যাংকারদের জন্য একটি শিক্ষার বছর। যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ দেওয়ার ফল কী হতে পারে, তা সবাই দেখেছেন। তাঁর ধারণা, ভবিষ্যতে নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকাররা অনেক বেশি সতর্ক থাকবেন। আস্থা ফেরানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের বৃহত্তম একটি ইসলামি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকের আমানতকারীদের পাওনা সরকার যদি সঠিকভাবে পরিশোধ করে, তাহলে আস্থা সংকট আর বড় সমস্যা হবে না।

