তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে গত বছরের মে মাসে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার নির্দেশনায় সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাংক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ জন্য সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) ‘ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে। খসড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবর্তে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)-কে ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এই প্রস্তাবে বেশির ভাগ অংশীজন একমত নন। বিশ্লেষকরা বলছেন, আবেগ নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
এফআইডি গত ২৬ নভেম্বর খসড়া প্রকাশ করে অংশীজনদের মতামত আহ্বান করলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউ মতামত দেননি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ ডিসেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অংশীজনদের মতামত নেয়ার জন্য একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অধিকাংশ অংশীজন অধ্যাদেশের নাম ‘ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক’ পরিবর্তে ‘মাইক্রো ফাইন্যান্স ব্যাংক’ রাখার এবং লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে নিয়োগ দেয়ার পক্ষে মত দেন।
প্রস্তাবিত খসড়া অধ্যাদেশে অনির্ধারিত সংখ্যক ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক স্থাপনের সুযোগ রাখা হলেও সভায় কেউ কেউ একটি বড় আকারের ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দেন। এছাড়া খসড়া অধ্যাদেশটি পর্যালোচনার জন্য বিভিন্ন অংশীজনের সমন্বয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় এফআইডির অতিরিক্ত সচিব মো. সাঈদ কুতুবকে।
কমিটির সদস্যরা হলেন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মহাপরিচালক ড. আহমেদ উল্লাহ, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের যুগ্ম সচিব এসএম শাফায়েত হোসেন, অর্থ বিভাগের উপসচিব ড. মো. রাশেদুর রহমান সরদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি বিভাগের যুগ্ম পরিচালক গোলাম মোস্তফা, এমআরএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ ইয়াকুব হোসেন, ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরামের নির্বাহী পরিচালক মো. সাজ্জাদ হোসেন, ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের জহিরুল আলম, পল্লী মঙ্গল সমিতির সিনিয়র অ্যাডভাইজার মো. এনামুল হক, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক ড. একেএম নুরুজ্জামান এবং এফআইডির উপসচিব মোহাম্মদ অতুল মণ্ডল। খসড়া অধ্যাদেশটি পর্যালোচনা করে ১০ দিনের মধ্যে মতামত দেয়ার কথা বলা হয়েছিল।
সূত্র জানিয়েছে, কারিগরি কমিটি এখন পর্যন্ত একটি আনুষ্ঠানিক ও একটি অনানুষ্ঠানিক সভা করেছে। তবে খসড়া অধ্যাদেশের বিষয়ে চূড়ান্ত মতামত এখনও পাওয়া যায়নি। আরও কিছু সভার পর মতামত জমা দেওয়া হতে পারে।
এ বিষয়ে এফআইডির সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, ‘কারিগরি কমিটির মতামত পাওয়ার পর অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে অধ্যাদেশ চূড়ান্ত করা হবে। এরপর এটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যাচাই-বাছাই কমিটিতে পাঠানো হবে। কমিটি অনুমোদন দিলে অধ্যাদেশ উপদেষ্টা পরিষদের সভায় উত্থাপিত হবে।’
ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থাসংক্রান্ত বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনা সৃষ্টি করেছে। প্রস্তাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবর্তে এমআরএকে লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এমআরএ ব্যাংকিং কার্যক্রমে অভিজ্ঞ নয়। এজন্য সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষমতা এমআরএর নেই। যদি এমআরএকে এ ক্ষমতা দেওয়া হয়, তাহলে আইন সংশোধন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও এফআইডির মধ্যে সমন্বয়হীনতা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য প্রভাব ফেলে। এমআরএকে নতুন নিয়ন্ত্রক করলে সমন্বয় আরও জটিল হবে।’
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ হিসেবে এমআরএ বা বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া হলে সুবিধা-অসুবিধা সব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আবেগ নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’
প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৩০০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ১০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাংকের ৬০ শতাংশ শেয়ার ঋণগ্রহীতাদের কাছে থাকবে। ব্যাংকের পর্ষদে একজন চেয়ারম্যান, তিনজন ঋণগ্রহীতা পরিচালক, তিনজন অন্যান্য পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকবেন। ব্যাংক কখনো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হবে না এবং অবসায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন প্রযোজ্য হবে না। লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ ছাড়া ব্যাংকের অবসায়ন সম্ভব হবে না।
ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশে ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক রয়েছে, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকই নিয়ন্ত্রক। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে এমআরএ থাকায় ব্যাংকের লাইসেন্সিং ক্ষমতা তাদের প্রয়োজন বলে মত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
এমআরএর এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘বিশ্বের অধিকাংশ দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকই ক্ষুদ্র ঋণ তদারক করে। বাংলাদেশে আলাদা সংস্থা রয়েছে। প্রচলিত ব্যাংক মুনাফাভিত্তিক, ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক সামাজিক ব্যবসার মডেল। বিনিয়োগকারীরা শুধু লভ্যাংশ পাবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে হলে কর ছাড় সুবিধা দিতে সমস্যা হতে পারে। তাই ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমআরএ হওয়া উচিত।’
প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক জামানতসহ বা জামানত ছাড়া ঋণ দিতে পারবে। উদ্যোক্তা সৃষ্টি, আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসা ও জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য থাকবে। ব্যাংক আমানত গ্রহণ, ঋণ প্রদান, বিনিয়োগ, বীমাসেবা এবং সরকারি সিকিউরিটিতে তহবিল বিনিয়োগ করতে পারবে। এছাড়া নতুন উদ্যোক্তাদের ফিসহ বা ফি ছাড়া কারিগরি ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করার সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘জনগণের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করা ব্যাংকিং কার্যক্রমের অংশ। অধিকাংশ কারিগরি কমিটি সদস্যের মত, যদি ব্যাংক হয় তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা হওয়া উচিত।’

