বাংলাদেশ ব্যাংক দুই বছর আগে ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদহার সীমা তুলে দিয়ে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়। এর আগে ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান বা ‘স্প্রেড’ নির্ধারণে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের সীমা ছিল। নতুন নিয়মে ব্যাংকগুলো নিজেদের মতো সুদহার ঠিক করতে পারছে। তবে এতে কিছু ব্যাংকে স্প্রেড ১০ শতাংশের ওপরে গিয়ে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এ প্রবণতা ঋণকে ব্যয়বহুল করছে এবং ব্যবসার খরচ বাড়াচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্প্রেড সহনশীল পর্যায়ে নামানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জানান, পার্শ্ববর্তী দেশে ঋণ ও আমানতের স্প্রেড ৩ শতাংশের নিচে। তাই বাংলাদেশে এ ব্যবধান কমানো জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে গড় স্প্রেড ৬ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। সর্বশেষ গত অক্টোবরে ব্যাংকগুলো গড়ে ৬.৪০ শতাংশ সুদে আমানত নিয়েছে। আর ঋণ দিয়েছে গড়ে ১২.১৪ শতাংশে। ফলে গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫.৭৪ শতাংশে। তবে সাতটি ব্যাংকের স্প্রেড ৮ থেকে ১০ শতাংশের ওপরে। ১৭টি ব্যাংকের স্প্রেড ৬ থেকে ৮ শতাংশের নিচে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে স্প্রেডে সর্বোচ্চ সীমা তুলে দেওয়ার সময় এটি ৩.৩৫ শতাংশ ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকে ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় এই বিষয়টি আলোচনায় আসে। এক নির্বাহী পরিচালক জানান, ২০২৪ সালের নির্দেশনার মাধ্যমে সুদহার বাজারভিত্তিক করা হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকগুলো স্প্রেড বাড়িয়ে ৫ থেকে ৮ শতাংশের ওপরে নিয়ে গেছে। এতে ঋণ ব্যয়বহুল হয়ে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গভর্নর জানিয়েছেন, নৈতিক চাপের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে সহনশীল পর্যায়ে নামাতে বলবেন। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দেওয়া হবে না।
কয়েকজন ব্যাংকারের সঙ্গে আলাপ থেকে জানা গেছে, কিছু ব্যাংকের খারাপ অবস্থার কারণে আমানতকারীরা তুলনামূলক ভালো ব্যাংকে টাকা রাখছেন। ফলে ভালো অবস্থানে থাকা ব্যাংকগুলো কম সুদে প্রচুর আমানত পাচ্ছে। কিন্তু ঋণের সুদহার কমাচ্ছে না। এর এক কারণ হলো বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকা। এছাড়া ট্রেজারি বিল ও বন্ডে টাকা রেখে ব্যাংক ১০ শতাংশের বেশি সুদ পাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় স্প্রেড বেড়ে ব্যাংকের মুনাফা বাড়ছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকের মুনাফা বোঝার জন্য স্প্রেড একমাত্র সূচক নয়। কারণ স্প্রেড হিসাবের সময় গ্রস সুদহার নেওয়া হয়। প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য নিট মুনাফা, খেলাপি ঋণসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করতে হবে।
স্মরণযোগ্য, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণের সুদহারে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সীমা রেখেছিল। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ‘স্মার্ট’ পদ্ধতি চালু হয়। এতে ১৮০ দিন মেয়াদি সরকারি ট্রেজারি বিলের ছয় মাসের গড় সুদের সঙ্গে ৩ শতাংশ যোগ করে সর্বোচ্চ সুদ নির্ধারিত হতো। ওই বছরের নভেম্বরে স্প্রেডে ৪ শতাংশের সীমা তুলে দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৮ মে সুদহার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রা বেচাকেনায় ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি চালু করে এক ধাপে প্রতি ডলারে ৭ টাকা বাড়িয়ে ১১৭ টাকা করা হয়।

