দেশে দুই বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলার পরও সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ছয় মাসের ব্যবধানে আবার কমানো যৌক্তিক নয়। দেশের বিপুলসংখ্যক অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, নারী ও প্রতিবন্ধী নাগরিক, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিদায়ী বছরের তুলনায় চলতি বছরে এক লাখ টাকা বিনিয়োগে প্রতি মাসে মুনাফা কমবে মাত্র ১১০ টাকা। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (ইআরডি) এই সিদ্ধান্ত সঞ্চয়পত্রভিত্তিক মানুষের ওপর আরও চাপ বাড়িয়েছে।
সরকারের সিদ্ধান্তে পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রসহ সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে মুনাফা কমেছে। ১ জানুয়ারি থেকে কেউ নতুন সঞ্চয়পত্র খুললে বা পুনর্বিনিয়োগ করলে সর্বোচ্চ মুনাফার হার হবে ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। সর্বনিম্ন মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশে। এর অর্থ, সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবার সঞ্চয়পত্রে গত বছর এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে যেখানে ৯৪৪ টাকা মুনাফা পাওয়া যেত, এবার সেখানে পাওয়া যাবে ৮৩৪ টাকা।
সরকারের যুক্তি অনুযায়ী, ব্যাংকের আমানত বাড়ানোর জন্য সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো হয়েছে। তবে বিগত সরকারের সময় ব্যাংক খাতে যে অবাধ লুটপাট হয়েছে, তার প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এখন তার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের। যদিও গত কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমেছে, তা এখনও ৮–৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের জন্য সংকট তৈরি করেছে। অনেকেই প্রতিনিয়ত আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে খাবার, ওষুধ ও সন্তানের চিকিৎসার মতো জরুরি খাত ছেঁটে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমালে ব্যাংকঋণের সুদও কমতে পারে, আর তার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। কিন্তু গত তিন বছরের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, আমাদের দেশে এই ধরনের পদক্ষেপ কার্যকর হয় না। বরং মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্টই বাড়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যাংক খাতে সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা না করে, লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে, মুমূর্ষু ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে আমানতের জোগান দিয়ে ক্রমাগত সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানো কি বাস্তবে কোনো ফল দেবে?
আরও বড় সমস্যা হলো, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলার কারণে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ সন্তোষজনক নয়। সাধারণ মানুষ তাদের সঞ্চিত অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করবেন, সেটা অনিশ্চিত। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে আস্থা তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব। দুঃখজনক হলেও সত্যি, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ বিষয়টি পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি।
সঞ্চয়পত্রের প্রধান গ্রাহক দেশের মধ্যবিত্ত পরিবার। তাদের অনেকের সংসারের একটি বড় অংশ চলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে। বড় অসুখ বা জরুরি পরিস্থিতিতে তারা এই মুনাফা ভেঙে পরিস্থিতি সামলান। তাই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মূল্যস্ফীতির সময়, বিপুলসংখ্যক নাগরিক যখন সংকটে আছে, তখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানো মোটেই যৌক্তিক নয়। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের উচিত এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা।

