বিভিন্ন ব্যাংক ক্রমেই ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে এমন এক সমান্তরাল আইনি কৌশল নিচ্ছে, যাকে সমালোচকরা ‘দ্বিগুণ শাস্তি’ হিসেবে দেখছেন। একদিকে তারা অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের সম্পত্তি জব্দ করছে, অন্যদিকে একই ঋণের জন্য চেক ডিজঅনার মামলায় ঋণগ্রহীতাদের জেল বা বড় অঙ্কের জরিমানা ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে।
ব্যাংকগুলো পাওনা আদায়ের জন্য প্রথমে অর্থঋণ আদালতে দেওয়ানি মামলা করে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত জামানত হিসেবে নেওয়া পোস্ট-ডেটেড বা ব্ল্যাঙ্ক চেক দেখিয়ে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের আওতায় ফৌজদারি মামলা চালু করে। ফলে অনেক ঋণগ্রহীতা বন্ধকী সম্পত্তি হারালেও একই ঋণের জন্য ফৌজদারি মামলার মুখে পড়ছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপ বা সমন্বিত বিচারিক নির্দেশনা না থাকায় হাজারো ঋণগ্রহীতা একযোগে একাধিক মামলার ঝুঁকিতে পড়ছেন। একই সঙ্গে সারাদেশে চেক ডিজঅনার মামলার চাপও বাড়ছে।
“এটি সুনিশ্চিতভাবে আইনের অপব্যবহার,” বলেন ব্যাংক ও কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট এমরান আহমেদ ভুঁইয়া। তিনি যোগ করেন, “ব্যাংকগুলো অর্থঋণ আদালতের রায়ের মাধ্যমে টাকা আদায় করছে, অথচ একই ঋণগ্রহীতাকে চেক ডিজঅনার মামলায় জেল বা জরিমানা দেওয়া হচ্ছে।”
এমন অসঙ্গতির কথা স্বীকার করছেন খোদ সিনিয়র ব্যাংকাররাও। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “অর্থঋণ আদালতে একটি মামলা নিষ্পত্তি হলে ব্যাংকের উচিত চেক ডিজঅনারের মামলা প্রত্যাহার করা। ব্যাংক যদি উভয় মামলা করে, তাহলে অর্থঋণ আদালতের রায়ের পর চেক ডিজঅনারের মামলা টেকা উচিত নয়।”
বাড়ছে মামলা, বাড়ছে চাপ:
সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে প্রায় ৪.৫ লাখ কোটি টাকার ৩ লাখ ২৪ হাজার ৮০৪টি চেক ডিজঅনার মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার মামলা—যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ২.৪৪ লাখ কোটি টাকা—ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খেলাপি ঋণ আদায়ে করেছে।
শুধু ২০২৪ সালে ব্যাংকগুলো প্রায় ২৬ হাজার চেক ডিজঅনার মামলা দায়ের করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের মধ্যে আরও ২৯ হাজার মামলা দায়ের হয়। এ থেকে বোঝা যায়, ঋণ আদায়ে ফৌজদারি মামলার ওপর ব্যাংকগুলোর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী সাদিকুল ইসলাম জীবনের ঘটনা এই চাপের মানবিক দিক তুলে ধরে।
জীবন ২০১২ সালের মার্চে সোনালী ব্যাংক থেকে ৭ কোটি টাকা ঋণ নেন। খেলাপি হওয়ার পর ২০১৫ সালে ব্যাংকটি ঋণ আদায়ের জন্য দেওয়ানি মামলা করে। একই সঙ্গে ৩০টি পোস্ট-ডেটেড ব্ল্যাঙ্ক চেক দেখিয়ে চেক ডিজঅনার মামলা দায়ের করা হয়। ২০২১ সালে অর্থঋণ আদালত সোনালী ব্যাংকের পক্ষে রায় দেন। কোনো ক্রেতা না পাওয়ায় ব্যাংক জীবনকে দেওয়া চারতলা বাড়ি ও ৩০ কাঠা জমি দখল নেয়।
তবু চাপ এখানেই শেষ হয়নি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে চেক ডিজঅনার মামলার রায়ে জীবনকে তিন বছরের কারাদণ্ড ও ১১ কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। জামিন পেতে তাঁকে ৫০ শতাংশ অর্থ, অর্থাৎ সাড়ে ৫ কোটি টাকা জমা দিতে বলা হয়। জীবন বলেন, সম্পত্তি হারানোর পর এটি করা অসম্ভব হয়ে যায়।
“অর্থঋণ আদালতের রায়ের পরও চেক ডিজঅনার মামলা চলতে থাকে,” জীবন বলেন। “ব্যাংক আগেই আমার সম্পত্তি নিয়েছে। ফলে সাড়ে ৫ কোটি টাকা দেওয়ার কোনো উপায় ছিল না।” শেষপর্যন্ত তিনি হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন। হাইকোর্ট রায় স্থগিত করেন এবং পরে চেক ডিজঅনার মামলাটি খারিজ হয়। জীবনের অভিযোগ, সোনালী ব্যাংক তাঁর সম্পত্তির মূল্য কম দেখিয়েছে। “২০১২ সালে ৮ কোটি টাকার মূল্য ধরে সম্পত্তি নেওয়া হয়েছে, অথচ ২০২২ সালে এর বাজারমূল্য অন্তত ৫ কোটি টাকা বেশি হওয়ার কথা,” তিনি বলেন। সম্পত্তি মূল্যায়ন নিয়ে করা তাঁর রিট এখনো বিচারাধীন।
সোনালী ব্যাংকের আইনজীবী বখতিয়ার হোসেন বলেন, “ব্যাংক আইনের মধ্যে থেকে পদক্ষেপ নিয়েছে। ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হওয়ার পরই চেক ডিজঅনার মামলা করা হয়েছে।”
ছোট ও মাঝারি ঋণগ্রহীতারাই বেশি ঝুঁকিতে:
অ্যাডভোকেট এমরান আহমেদ ভুঁইয়া বলেন, অর্থঋণ আদালত আইন অনুযায়ী ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা করতে পারে। চেক জামানত নিলে চেক ডিজঅনারের মামলাও করা সম্ভব। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অর্থঋণ আদালতের রায়ের মাধ্যমে ঋণ আদায় হলেও ঋণগ্রহীতাদের চেক ডিজঅনার মামলায় জেল বা জরিমানা ঝুঁকি থেকে যায়।
তিনি আরও বলেন, ছোট ও মাঝারি ঋণগ্রহীতারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। “ছোট ও মাঝারি ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে ব্যাংক একদিকে স্থাবর সম্পত্তি জামানত নেয়, অন্যদিকে ব্ল্যাঙ্ক চেকও নেয়। কিন্তু বড় ঋণের কেলেঙ্কারিতে এই ধরনের চেক জামানতের নজির নেই। এটি ব্যাংকগুলোর দ্বৈত নীতি স্পষ্ট করে,” ভুঁইয়া উল্লেখ করেন।
সমান্তরাল মামলার মধ্যেই রায়:
ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ১,৭২৮টি চেক ডিজঅনার মামলায় রায় হয়েছে। এর মধ্যে ৯৮৩টি মামলা ছিল বিভিন্ন ব্যাংকের দায়ের করা, যার সঙ্গে জড়িত প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ।
আদালতের এক কর্মকর্তা বলেন, রায়প্রাপ্ত এসব মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা ছিল বা আছে। অনেকের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতের রায়ের পর ব্যাংক তাদের স্থাবর সম্পত্তি দখলে নিয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী এই আদালতের কোনো এখতিয়ার নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যাংক মামলা প্রত্যাহার না করে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি)-এর প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত জামানত হিসেবে চেক নেওয়ার সুযোগ থাকলেও, যথাযথ সম্পত্তি যাচাই করলে চেক না নিয়েও কাজ চলতে পারে। তিনি বলেন, “অর্থঋণ আদালতের মামলা নিষ্পত্তি হলে ব্যাংকের উচিত চেক ডিজঅনারের মামলা প্রত্যাহার করা।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুহাম্মদ এ. (রুমী) আলী বলেন, “চেক-ভিত্তিক মামলার প্রবণতা বাড়ছে, যা ব্যাংক, গ্রাহক ও আদালত—সব পক্ষের জন্যই চাপ তৈরি করছে। ঋণ আদায়ে একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো জরুরি।”
হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ:
জনতা ব্যাংক বগুড়া শাখা থেকে ২০২১ সালে লিপু রহমান নামের একজন ব্যবসায়ী ৬.৫ কোটি টাকা ঋণ নেন। ঋণ খেলাপি হওয়ায় ব্যাংক ৯.৭৪ কোটি টাকা আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করেন। পরবর্তীতে, গত বছরের জুনে চেক ডিজঅনারের আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়।
লিপু রহমান চেক ডিজঅনার মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। এবছরের জুনে হাইকোর্ট মামলাটি সাময়িকভাবে স্থগিত করেন এবং বৈধতা বিষয়ে রুল জারি করেন। ১১ সেপ্টেম্বর সেই রুল নিষ্পত্তি করে হাইকোর্ট চেক ডিজঅনার মামলাটি বাতিল করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ ক্রমেই বেড়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়ের করা ১৯,৪০৬ টি চেক ডিজঅনার মামলা স্থগিত করা হয়েছে। এর সঙ্গে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা জড়িত। ২০২৪ সালে হাইকোর্ট এই ধরনের প্রায় ২৬ হাজার মামলা স্থগিত করেন, যার সঙ্গে ছিল প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। তবে অ্যাডভোকেট এমরান আহমেদ ভুঁইয়া জানান, হাইকোর্টের এসব স্থাগিতাদেশ চেক ডিজঅনার মামলার জন্য হলেও এসব রিটকারীদের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে চলমান ব্যাংক মামলা পরিচালনায় কোনো বাধা সৃষ্টি করে না।
চেক জামানত নিয়ে আইনি অনিশ্চয়তা:
২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর হাইকোর্ট একটি রায় দেন, যেখানে বলা হয়, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ আদায়ে চেক ডিজঅনার মামলা করতে পারবে না। রায়ে উল্লেখ করা হয়, “আজ থেকে চেক ডিজঅনার সকল মামলা স্থগিত থাকবে। ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সকল ঋণের বিপরীতে ইন্সুরেন্স কভারেজ থাকতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা এবং জাতীয় সংসদকে আইন সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হলো।”
তবে পরবর্তীতে ব্র্যাক ব্যাংক রায়টি চ্যালেঞ্জ করে। ব্র্যাক ব্যাংকের আইনজীবী মুনিরুজ্জামান বলেন, হাইকোর্টের ওই রায় আপিলের প্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ স্থগিত করেছেন। আপিলটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে চেক জামানত সংক্রান্ত আইনি প্রশ্নও এখনো অনিশ্চিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান:
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, চেক নেওয়া বা চেক ডিজঅনার মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাধা নেই। তিনি জানান, “আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে, যেখানে ঋণের জামানত হিসেবে চেক নেওয়াকে অনুৎসাহিত করা হয়েছে। তবে হাইকোর্টের রায়ের ওপর আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ থাকায় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করতে পারছে না। আপিলের রায়ের ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরবর্তী সিদ্ধান্ত।”

