প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশকে ঘিরে ‘মিশন ড্রিফট’ ও খাত সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ক্ষুদ্রঋণ খাতের শীর্ষ নেতারা। তাদের মতে, খসড়া অধ্যাদেশটি খাতের বাস্তবতা ও কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে ক্ষুদ্রঋণের মূল দর্শন থেকে সরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
দেশের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে আরও সংগঠিত করা এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রণীত ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এই খসড়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
খসড়া অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ব্যাংকটি সামাজিক ব্যবসা মডেলে পরিচালিত হবে। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। প্রাথমিক পরিশোধিত মূলধন ১০০ কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ৬০ শতাংশ শেয়ার থাকবে ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের হাতে। লভ্যাংশ ব্যক্তিগতভাবে বিতরণ না করে জনকল্যাণমূলক কাজ ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে ব্যয় করার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে ক্ষুদ্রঋণ খাতের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে জানান, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত উন্নয়নভিত্তিক ও অলাভজনক কাঠামোয় পরিচালিত হয়। ব্যাংকে রূপান্তরের ফলে এসব প্রতিষ্ঠান মুনাফাভিত্তিক হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ঋণ ও সেবা পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই রূপান্তরের ফলে ক্ষুদ্রঋণ খাত তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের বিদ্যমান সমস্যা, যেমন খেলাপি ঋণ ও সুশাসনের ঘাটতি, ক্ষুদ্রঋণ খাতেও সংক্রমিত হতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ‘মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়াটি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে প্রস্তুত করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে মতামতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে। তবে খসড়া প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি।
খাতের নেতারা অভিযোগ করেছেন, অধ্যাদেশে একাধিক ব্যক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজস্ব অর্থায়নে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে দেশি ও বিদেশি কর্পোরেট বিনিয়োগকারীদের এই খাতে প্রবেশের পথ উন্মুক্ত হবে। তাদের আশঙ্কা, এতে ক্ষুদ্রঋণের স্বকীয়তা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা দুর্বল হয়ে পড়বে। তারা আরও বলেন, বিদ্যমান ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে ব্যাংকে রূপান্তরিত হবে, সে বিষয়ে অধ্যাদেশে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। এতে অনিশ্চয়তা বাড়বে।
ক্ষুদ্রঋণ খাতের প্রতিনিধিরা জানান, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা বা মতামত গ্রহণ ছাড়াই এই খসড়া তৈরি করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, “এমআরএর আওতায় থাকা যেসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকে রূপান্তরের আগ্রহ থাকতে পারে, তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি। আমাদের আশঙ্কা, এই অধ্যাদেশ বিদ্যমান সমস্যার সমাধান না করে উল্টো নতুন সংকট তৈরি করবে।”
দেশের একটি শীর্ষ মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’ একটি অবাস্তব, অপরিকল্পিত এবং তাড়াহুড়ো করে নেওয়া উদ্যোগ। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এই অধ্যাদেশ চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিষয়টি তারা সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন।
তার মতে, সামাজিক ব্যবসা ও বেসরকারি বাণিজ্যিক কাঠামোর এমন মিশ্রণ বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। গ্রাহকদের ৬০ শতাংশ মালিকানা এবং লভ্যাংশ বণ্টনে সীমাবদ্ধতা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করবে। তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্রঋণের মূল লক্ষ্য সামাজিক উন্নয়ন। কিন্তু মুনাফাভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রবেশের সুযোগ তৈরি হলে এই খাতের মৌলিক উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
নতুন আইনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বাড়বে বলেও তিনি আশঙ্কা করেন। তার মতে, এমআরএর অনুমোদন ছাড়া নির্বাহী নিয়োগ বা বরখাস্ত করতে না পারার বিধান প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি একটি ব্যাংক তদারকির মতো পর্যাপ্ত জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা এমআরএর নেই।
এ বিষয়ে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহী বলেন, তারা চলতি সপ্তাহের মধ্যেই স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সেখানে খসড়া অধ্যাদেশের জটিল দিকগুলো তুলে ধরা হবে।

