দেশের অর্থনীতির বড় ক্ষত ব্যাংক খাত। দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি। অথচ অধিকাংশ ব্যাংক নানা সমস্যায় জর্জরিত। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং সুশাসনের সংকট।
এমন পরিস্থিতিতে আবার নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া অনেকেই অযৌক্তিক মনে করছেন। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় ‘ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’ শীর্ষক একটি খসড়া প্রণয়ন করেছে। কিন্তু এই খসড়া চূড়ান্ত করার আগে দেশের ব্যাংক খাতের বাস্তব অবস্থা এবং চ্যালেঞ্জগুলো পর্যাপ্তভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে বর্তমানে তফসিলভুক্ত ব্যাংকের সংখ্যা ৬২টি। এর মধ্যে ৪৩টি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেসরকারি উদ্যোগে। ব্যাংকের সংখ্যা বড় ধরনেরভাবে বেড়েছে ২০০৯ সালের পর। সে সময় থেকে আওয়ামী সরকার বিভিন্ন নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেয়। অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালীদের উপস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শুধু নতুন ব্যাংকই নয়, বিদ্যমান ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদসহ নানা পর্যায়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই পরিবর্তনেও রাজনৈতিক মতাদর্শকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ব্যাংকের সংখ্যা বাড়লেও সেবার মানে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। দেশে ব্যাংকের শাখা-প্রশাখা বেড়েছে, কিন্তু পরিচালন ব্যয়ও অনেক বেড়েছে।
এই ব্যয় মেটাতে বেশির ভাগ ব্যাংক মুষ্টিমেয় শিল্পপতিদের ঋণ দিয়েছে। বিশেষত তারা যাদের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সান্নিধ্যে থাকা ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত। খেলাপি ঋণের তালিকায় অনেক ক্ষেত্রেই তৎকালীন সরকারের মন্ত্রীদের নামও আছে। অনেক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদই এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিল। এভাবে ব্যাংক খাত ব্যাপকভাবে রাজনৈতিকীকরণের শিকার হয়েছে। সুশাসনের অভাব তীব্র হয়েছে। সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির ফলে অনাদায়ী ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ ব্যাংকের মূলধন কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এ অবস্থায় আবার নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া নিয়ে বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় ‘ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’ শীর্ষক খসড়া প্রণয়ন করেছে। তবে দেশের ব্যাংক খাতের বাস্তব পরিস্থিতি, খেলাপি ঋণের প্রকোপ, মূলধন সংকট এবং সুশাসনের দুর্বলতা পর্যাপ্তভাবে পর্যালোচনা না করে নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া অযৌক্তিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমান বাংলাদেশের ব্যাংক খাত গভীর সংকটের মধ্যে আছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর দেশে ব্যাংক খাত সংস্কারের কথা উঠে। সেই আলোচনার একটি বড় অংশ ছিল ব্যাংকের সংখ্যা কমানো। এর অংশ হিসেবে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে একটি ব্যাংকে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কিন্তু এখন গ্রাহকরা হতাশ। অনেক আমানতকারী তাদের টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। পাশাপাশি, কেবল সোনালি ব্যাংক ছাড়া অন্য সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সংস্কারের মাধ্যমে পুনর্গঠনের দিকে না গিয়ে নতুন ব্যাংক অনুমোদনের উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এটি অগ্রহণযোগ্য বলছেন। তাদের মতে, দেশের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ব্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়। বরং সরকারের মনোযোগ ও অগ্রাধিকার থাকা উচিত ব্যাংকের পূর্ণ সুশাসন নিশ্চিত করা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
বিশ্বের উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর ব্যাংক খাত এই বিষয়ে দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণযোগ্য। বিশেষ করে চীনের ব্যাংক খাত। সম্পদের পরিমাণের দিক থেকে চায়না কনস্ট্রাকশন ব্যাংক করপোরেশন, ব্যাংক অব চায়না, এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না বিশ্বের বৃহৎ ব্যাংকের তালিকার শীর্ষে রয়েছে। এই সব ব্যাংকই রাষ্ট্রায়ত্ত। এর বাইরে চীনে বিভিন্ন অঞ্চল ও খাতের জন্য আলাদা ব্যাংক রয়েছে।
ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা চীনের উদাহরণ থেকে বোঝা যায়। ১৯৭৮ সালের পর চীন ধাপে ধাপে আর্থিক সংস্কারের মাধ্যমে একক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে আধুনিক, ব্যাংকনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটায়। এক সময় দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম পুনর্গঠন, বাণিজ্যিক ব্যাংক আইন প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঋণ শ্রেণীবিন্যাস, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির মাধ্যমে অকার্যকর ঋণ স্থানান্তর এবং পর্যায়ক্রমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মতো কাঠামোগত সংস্কারের ফলে চীনের ব্যাংক খাত শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি ব্যাংকের নির্দিষ্ট কাজ রয়েছে এবং কোনো ব্যাংক তার নির্ধারিত খাতের বাইরে ঋণ দেয় না। ফলে প্রতিটি খাতের উন্নয়নে ব্যাংকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিশ্চিত হয়।
বাংলাদেশের তুলনায় অন্যান্য দেশের উদাহরণও শিক্ষণীয়। সমসাময়িক একাধিক অর্থনীতির দেশে ব্যাংকের সংখ্যা সীমিত রাখা হয়েছে।
- থাইল্যান্ডে জিডিপির আকার ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হলেও সরকারি খাতে ৬টি, বেসরকারি খাতে ১২টি ব্যাংক।
- সিঙ্গাপুরে স্থানীয় ব্যাংকের সংখ্যা মাত্র ৫টি।
- মালয়েশিয়ায় স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ব্যাংকের সংখ্যা ৮টি।
- প্রতিবেশী ভারতেও বাংলাদেশের তুলনায় কম ব্যাংক রয়েছে—সরকারি ১২টি, বেসরকারি ২২টি, সঙ্গে অঞ্চলভিত্তিক ৪৩টি ব্যাংক এবং ৪৬টি বিদেশী ব্যাংক।
- যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫০০০ ব্যাংক থাকলেও প্রতিটি ব্যাংক রাজ্য, শহর বা অঞ্চলের ওপর নির্ভর করে কাজ করে।
এই উদাহরণগুলো স্পষ্ট বার্তা দেয়: ব্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি বেশি জরুরি। এজন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কাঠামোগত সংস্কার এবং কার্যক্রম সুশৃঙ্খল রাখা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও বর্তমান অবস্থায় এটি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি ব্যাংক খাত সুসংগঠিত হতো এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা যেত, তবে দেশের অনেক অর্থনৈতিক সংকট এড়ানো যেত।
ব্যাংক খাতে সুশাসন কতটা জরুরি তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে শ্রীলংকার উদাহরণে। সে দেশের ব্যাংক খাত অলিগার্কদের হাতে নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল না। ব্যাংকের মূল সম্পদ হলো ঋণ। কিন্তু শ্রীলংকার কিছু ক্ষেত্রে ঋণের নামে লুণ্ঠন করা হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে ঋণ পরিশোধ হয়নি। এর ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দিন দিন বেড়েছে। একইভাবে ব্যাংক খাতের সঙ্গে লুণ্ঠনের শিকার হয়েছে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও। বর্তমানে অন্তত ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রুগ্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই বাস্তবতায় নতুন ব্যাংক অনুমোদন না দেওয়া সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ।
বর্তমানে নতুন ব্যাংক অনুমোদনের যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে: আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো, উদ্যোক্তা সৃষ্টি বা সামাজিক ব্যবসার উন্নয়ন। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, এসব লক্ষ্য অর্জনে আলাদা ব্যাংক গঠন প্রয়োজন নয়। বিদ্যমান ব্যাংকের মধ্যেই বিশেষায়িত উইন্ডো, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে এই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব। এতে ব্যাংক খাতও টেকসই হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারের এখন গুরুত্ব দেওয়া উচিত ব্যাংকের সংখ্যা নয়। বরং ব্যাংকের বোঝা কমানো, সেবার মানোন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি। নতুন ব্যাংক অনুমোদন দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম সুশৃঙ্খল করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ও লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে।

