খেলাপি ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিপুলসংখ্যক প্রার্থী। তবে খেলাপি প্রার্থীদের বিষয়ে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে জাহাঙ্গীর আলম সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
সাংবাদিকদের প্রশ্ন, “নির্বাচন কমিশন থেকে খেলাপিদের তথ্য আসলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী করবে?”–এর জবাবে গভর্নর এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে সরাসরি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। ব্যাংকিং আইন অনুযায়ী সিআইবি রিপোর্টের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ব্যবস্থা নেবে।”
একইসঙ্গে তিনি জানান, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক চালু হওয়ার পর প্রথম দুই দিনে বড় ধরনের গ্রাহক চাপ তৈরি হয়নি। এ সময় ১০৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা উত্তোলনের বিপরীতে ৪৪ কোটি টাকা নতুন আমানত এসেছে। এটি গ্রাহকদের আস্থার প্রমাণ বলে উল্লেখ করেন গভর্নর।
তিনি বলেন, “ব্যাংকটি পূর্ণমাত্রায় লেনদেনের জন্য খুললে কী ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে, তার জন্য আমরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত কার্যক্রম সুন্দর ও স্থিতিশীলভাবে চলছে। নতুন ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পাঁচটি একীভূত ব্যাংকের প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।”
গভর্নর আরও জানান, সাধারণভাবে একটি নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ সময় লাগে। তবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে মাত্র দুই মাসে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই), ক্যাপিটালাইজেশন, সাইনবোর্ড স্থাপন ও লেনদেন শুরু করা সম্ভব হয়েছে। নতুন ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশের আওতায় ধাপে ধাপে এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি উত্তোলন হয়েছে এক্সিম ব্যাংক থেকে—৬৬ কোটি টাকা। এখানে ৬ হাজার ২৬৫ জন গ্রাহক লেনদেন করেছেন। সবচেয়ে বেশি জমাও হয়েছে এ ব্যাংকে, যা ২৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা। নতুন বছরের শুরু থেকে প্রথম দুই দিনে মোট জমা হয়েছে ৪৪ কোটি ৯ লাখ টাকা।
এক্সিম ব্যাংকের পর ইউনিয়ন ব্যাংকে জমা হয়েছে ১৫ কোটি ২৪ লাখ, এসআইবিএলে ৩ কোটি ৪৯ লাখ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামীতে ৪৮ লাখ এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৬২ লাখ টাকা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ অনুযায়ী রেজুলেশন স্কিম ইতিমধ্যেই জারি করা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী আমানতকারীদের সঙ্গে লেনদেন চলছে। নতুন বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়াও চলমান। প্রাথমিকভাবে সরকারি প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বোর্ড গঠন করা হয়েছে। শিগগির একজন স্বতন্ত্র পরিচালক, একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, একজন ব্যাংকার ও একজন আইন বিশেষজ্ঞ যুক্ত হবেন।
দুই দিনের লেনদেনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে গভর্নর জানান, ১ ও ৪ জানুয়ারি মোট ১৩ হাজার ৩১৪টি উত্তোলন লেনদেন হয়েছে। এতে মোট উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। নতুন আমানত এসেছে ৪৪ কোটি টাকা। নেট অবস্থায় পরিস্থিতি সন্তোষজনক।
তিনি বলেন, কোথাও উত্তোলনের চেয়ে আমানতের পরিমাণ বেশি হয়েছে। এটি প্রমাণ করে গ্রাহকরা নতুন ব্যাংকের প্রতি আস্থা রাখছেন এবং সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে জনগণ বিশ্বাস রাখছে। গভর্নর উল্লেখ করেন, সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—একটি হলো সমন্বিত আইটি সিস্টেম চালু করা, অন্যটি পাঁচটি ব্যাংকের অতীত অনিয়ম খতিয়ে দেখা ফরেনসিক অডিট। পাশাপাশি দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তারা নিরাপদ ও স্বচ্ছ পরিবেশে কাজ করতে পারবেন, তা নিশ্চিত করা হবে।
শরিয়াহভিত্তিক মুনাফার হার বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যমান ও নতুন পণ্য একীভূত করে গ্রাহকদের জন্য নতুন শরিয়াহসম্মত পণ্য চালু করা হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আগামী ১৯ জানুয়ারি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠান হবে। গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
গভর্নর বলেন, “আমরা কাউকে ছাঁটাই করতে চাই না। তবে কোনো অনিয়মে জড়িত থাকলে ছাড় দেওয়া হবে না। এই পাঁচ ব্যাংক ফরেনসিক পর্যবেক্ষণে আনা হবে।” সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আইয়ুব মিয়া ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

