আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের আর্থিক খাত পড়ে যায় গভীর সংকটে। অর্থ পাচার ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের লুটপাটে ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আর্থিক খাতে নৈরাজ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নেন ড. আহসান এইচ মনসুর।
দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। ডলারের সংকট তীব্র হয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে কমতে তলানিতে নেমে আসে। ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক পড়ে যায়। তারল্যসংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল।
গত ১৬ মাসে ড. আহসান এইচ মনসুর আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখিয়েছেন। পুরোপুরি স্থিতি ফিরতে সময় লাগবে। তবে তিনি একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তার নেতৃত্বে ডলারসংকট, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও ঋণশৃঙ্খলা নিয়ে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
ব্যাংকিং খাতের তারল্যসংকট মোকাবিলায় দুর্বল ও সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে নতুন টাকা ছাপিয়ে ঋণ দেওয়া হয়। এসব উদ্যোগের ফলে রিজার্ভের অব্যাহত পতন থেমে যায়। স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। রিজার্ভে হাত না দিয়েই বাংলাদেশ প্রায় পৌনে ২ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ পরিশোধ করেছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পের ঋণ ও সুদ বাবদ সরকার পরিশোধ করেছে প্রায় সোয়া ১ বিলিয়ন ডলার। সামগ্রিকভাবে তারল্য ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও আস্থাহীনতার কারণে গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক চিত্র কিছুটা বদলেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকে পুনরায় জমা হয়েছে ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ দশমিক ৭৬ লাখ কোটি টাকা। নভেম্বরে এ অঙ্ক ছিল ২ দশমিক ৭৭ লাখ কোটি টাকা। যদিও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নগদ অর্থ ছিল ২ দশমিক ৫৫ লাখ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রবণতা উল্টো পথে হাঁটছে।
সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিক উদ্যোগ নেয়। কমপক্ষে ১২টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। দখলদারদের হাত থেকে ব্যাংক উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে কাগুজে নোট ছাপিয়ে তারল্যসংকট কমানোর পথ থেকে সরে আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গভর্নরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ। আর্থিক সংকটে পড়া শরিয়াহভিত্তিক এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত হয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। অনেক শাখার সাইনবোর্ড ইতোমধ্যে পরিবর্তন করা হয়েছে।
গত বছরের ১ ডিসেম্বর ব্যাংকটিকে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। পাঁচটি বেসরকারি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত এই ব্যাংক নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে স্বাভাবিক লেনদেন শুরু করে। আমানতকারীরা এখন নির্বিঘ্নে টাকা জমা ও উত্তোলন করতে পারছেন। এতে ব্যাংকিং খাতে মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরছে।
খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল নিয়েও বড় সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রকৃত ব্যবসায়ী যারা বাস্তব কারণে খেলাপি হয়েছেন তাদের জন্য এ সুযোগ রাখা হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যবসায়িক সংকট বা ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাঙা করাই লক্ষ্য।
নতুন ব্যবস্থায় ২ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর। নিয়মিত হলে প্রথম দুই বছর কিস্তি পরিশোধে বিরতি পাওয়া যাবে। ফলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা খেলাপি তালিকা থেকে বেরিয়ে আসবেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, পুনঃতফসিলের আবেদন পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। এককালীন ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও এক বছর সময় পাওয়া যাবে। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আলাদা অনুমতি লাগবে না।
এই পদক্ষেপে চাপের মুখে থাকা ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে নির্ধারিত শর্তে ঋণ পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। অর্থনীতিকে সচল রাখতে এসব উদ্যোগ জরুরি। তবে টেকসই স্থিতিশীলতার জন্য আরও সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

