রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক হল-মার্ক গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির প্রভাব কাটিয়ে শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি গড়েছে। ব্যাংকটি বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জনের পথে ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। এর ফলে আরও বেশি গ্রাহকের কাছে ব্যাংকের সেবা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।
সূত্র জানায়, ব্যাংকটি এখন বড় ঋণগ্রহীতাদের এড়িয়ে ছোট ঋণগ্রহীতাদের বেছে দিচ্ছে। এতে দিন দিন বেসরকারি খাতে ঋণের স্থিতি কমছে। ২০২৫ সালে সোনালী ব্যাংক বিনিয়োগ, সুদ আয় ও কমিশন থেকে পরিচালন মুনাফা আড়াই হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য ছাড়িয়ে মোট আট হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করেছে। এতে মূলধনের ঘাটতি মিটিয়ে নিট মুনাফার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। তবে হল-মার্ক, বেক্সিমকো, থারমেক্স, ওরিয়নসহ কয়েকটি গ্রুপের ঋণ ও বিনিয়োগ আদায় এখনও ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমছে না। ২০২৫ সালের আর্থিক চিত্র পর্যালোচনায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান বলেন, “আমরা ঋণ আদায় জোরদার করার পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে উৎসাহ দিচ্ছি। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। একটি শক্তিশালী ভিত্তির ব্যাংক হতে যা প্রয়োজন, আমরা তা করছি। এর ফলে ব্যাংক ভালো আয় করছে।”
সোনালী ব্যাংকের আমানত-ঋণ বেড়েছে দ্রুত:
সোনালী ব্যাংকের গত পাঁচ বছরের আর্থিক চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে ব্যাংকটির আমানত ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮২ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ পাঁচ বছরে আমানত বেড়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। ঋণের পরিমাণও একই সঙ্গে বেড়েছে। ২০২১ সালে ঋণের স্থিতি ছিল ৬৯ হাজার ৬০ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৭২৩ কোটি টাকায়।
সরকারি খাতে ঋণ ২০২১ সালে ছিল ২০ হাজার ৫৬ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ৩৯ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতে ঋণ ২০২১ সালে ৪৯ হাজার ৪ কোটি টাকা থাকলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ হাজার ১৫৯ কোটি টাকায়। উল্লেখ্য, ২০২৪ সাল শেষে বেসরকারি খাতের ঋণ ছিল ৬৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ব্যাংকটি সরকারি ও বেসরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করেছে। তবে এসব অর্থ অনেক ক্ষেত্রে আটকা পড়েছে, বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার সমর্থিত ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা অর্থ। তবে খেলাপি ঋণের হার তেমন বাড়েনি। দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলেও সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এখনো ১৮ শতাংশে রয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরনো খেলাপি ঋণ অবলোপন করে সোনালী ব্যাংককে আর্থিক স্থিতি পরিষ্কার করতে হবে। এজন্য মুনাফা বাড়িয়ে পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।
সোনালী ব্যাংকের রেকর্ড মুনাফা, মূলধনে দৃঢ় উন্নতি:
বিদায়ী বছরে সোনালী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে পরিচালন মুনাফায়। ২০২১ সালে যেখানে পরিচালন মুনাফা ছিল মাত্র ২ হাজার ৯০ কোটি টাকা, ২০২৫ সালে তা চার গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১৭ কোটি টাকায়।
ব্যাংকটি ২০২৫ সালে বিনিয়োগ থেকে আয় করেছে ৯ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। সুদ আয় হয়েছে ৭ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। কমিশন ও মুদ্রা বিনিময় থেকে যথাক্রমে আয় হয়েছে ১ হাজার ৩৮ কোটি ও ৩৫৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে আমানতকারীদের ৬ হাজার ২২৭ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করেছে, বেতন-ভাতা বাবদ খরচ হয়েছে ২ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। ফলে সুদ থেকে প্রকৃত আয় দাঁড়িয়েছে ২৬৮ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে সোনালী ব্যাংক বড় পরিচালন মুনাফা করেছে। ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চয় সংরক্ষণের পর বিদায়ী বছরের হিসাব অনুযায়ী নিট মুনাফার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। ২০২৪ সালে ব্যাংকের মুনাফা ছিল ৮৬৬ কোটি টাকা।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে মূলধন–ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকটি ২০২৫ সালের শেষের দিকে তা মিটিয়ে নিয়েছে। ২০২১ সালে মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ঋণাত্মক ০.১৫ শতাংশ ছিল। তবে ধারাবাহিক উন্নতির ফলে ২০২৫ সালে তা বেড়ে ১০.১০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ব্যাংকের জন্য বড় ধরণের সাফল্য।

