বাজারদরের প্রায় দ্বিগুণ দামে জমি কিনে রাজধানীতে সুউচ্চ ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিটি ব্যাংক। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ব্যাংক খাত, পুঁজিবাজার ও সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এই বিপুল ব্যয়ের সিদ্ধান্তে ব্যাংকটির বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের স্বার্থ আদৌ কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক বেশি দামে জমি কেনার ফলে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত মুনাফার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে পুঁজিবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ওপর—যাঁরা প্রত্যাশিত লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। একই সঙ্গে মুনাফা কমলে সরকারকেও কম কর দিতে হবে, ফলে রাষ্ট্রীয় রাজস্বের অংশও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিটি ব্যাংক রাজধানীর গুলশান অ্যাভিনিউয়ে মোট ৪০ কাঠা জমির ওপর ২৮ তলা নিজস্ব ভবন নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে আগে থেকেই ব্যাংকের মালিকানায় থাকা ২০ কাঠা জমির সঙ্গে নতুন করে পার্শ্ববর্তী আরও ২০ কাঠা জমি কেনা হচ্ছে।
নতুন জমি কেনাসহ আনুষঙ্গিক সব ব্যয় মিলিয়ে প্রাথমিকভাবে খরচ ধরা হয়েছে ৩৪৫ কোটি টাকা। কিন্তু এখানেই বিতর্কের শুরু। কারণ, নতুন করে কেনা ২০ কাঠা জমির জন্য ব্যাংকটি কাঠাপ্রতি প্রায় ১৭ থেকে ১৮ কোটি টাকা ব্যয় করছে—যা স্থানীয় বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও জমি কেনাবেচার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, গুলশান অ্যাভিনিউ এলাকায় বর্তমানে প্রতি কাঠা কমার্শিয়াল জমির বাজারদর কম-বেশি ৮ কোটি টাকা। সেখানে সিটি ব্যাংক জমি কিনছে প্রতি কাঠা ১৭ কোটি ২৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ দামে।
এই অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। জমি ব্যবসার সঙ্গে যুক্তদের ধারণা, এত বেশি দামে একটি বড় প্রতিষ্ঠানের জমি কেনা আশপাশের জমি ও ভবনের বাজারেও অস্বাভাবিক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এত বেশি দাম দিয়ে জমি কেনার পেছনে যুক্তি কী।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে জমি কেনা হলে সেখানে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়। তাঁর ভাষায়, “এক্ষেত্রে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার কোনো চেষ্টা হয়েছে কি না, বিক্রেতা প্রকৃতপক্ষে সেই অর্থ পেয়েছেন কি না, জমির প্রকৃত দাম কত হওয়া উচিত—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার সুযোগ থাকে। প্রয়োজনে তদন্ত হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।”
ব্যাংক সূত্র জানায়, আগের ও নতুন কেনা জমি মিলিয়ে মোট ৪০ কাঠার ওপর ২৮ তলা ভবন নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ৮৫৫ কোটি টাকা। জমি কেনা ও ভবন নির্মাণ মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
এই প্রকল্পের জন্য ইতোমধ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত বুধবার সিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ভবন নির্মাণ ও অতিরিক্ত ২০ কাঠা জমি কেনার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়েছে।
সিটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৩ সালে, দেশের তৎকালীন ১২ জন শীর্ষ ব্যবসায়ীর উদ্যোগে। ১৯৮৬ সালে ব্যাংকটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। দীর্ঘদিন পর ২০০৯ সালে ব্যাংকটি প্রথমবারের মতো নিজস্ব ভবনে প্রধান কার্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করে।
গুলশান-২ সংলগ্ন গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ২০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত আটতলা ভবনে ছিল ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়। কিন্তু জনবল ও কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় জায়গা সংকুলান হচ্ছিল না। সে কারণেই পুরনো ভবন ভেঙে নতুন করে ২৮ তলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নতুন করে জমির পরিমাণ বাড়ায় ভবনের পরিসর ও উচ্চতা আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবনের পাঁচটি তলা গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য বরাদ্দ থাকবে এবং বাকি ২৩ তলায় চলবে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কার্যক্রম।
যেহেতু সিটি ব্যাংক একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি, তাই এত বড় অঙ্কের ব্যয়ে জমি কেনা ও ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্তকে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ব্যাংকের শেয়ারের দাম ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর পড়তে পারে।
ব্যাংকটি শেয়ারবাজারে এ তথ্য প্রকাশ করলেও প্রশ্ন উঠেছে—এই বিপুল অপচয়ের ফলে ভবিষ্যতে ব্যাংকের মুনাফা কমে গেলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাই কি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না?
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন গণমাধ্যমকে বলেন, “বিশ্বজুড়ে ব্যাংকের ভবন ও প্রধান কার্যালয়গুলো নান্দনিক ও আধুনিক হয়ে থাকে। আমরাও দেশের ব্যাংক খাতে তেমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, এই পরিকল্পনায় সম্মতি দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি তারা কৃতজ্ঞ। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই নিজস্ব ভবনে কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছেন তারা।
তবে সব ব্যাখ্যার পরও প্রশ্ন থেকে যায়—একটি আমানতভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এত বড় ব্যয় কতটা যুক্তিসংগত? বাজারমূল্যের দ্বিগুণ দামে জমি কেনা কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল? আর এর দায় শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে কার কাঁধে—ব্যাংক কর্তৃপক্ষের, নাকি সাধারণ গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের?

