আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠেয় গণভোটে প্রচার চালাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই নির্দেশনা ব্যাংকিং খাতের অনেক শীর্ষ নির্বাহীর মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এক চিঠিতে ব্যাংকগুলোকে প্রতিটি শাখায় ব্যানার টাঙিয়ে গণভোটে অংশগ্রহণে মানুষকে উৎসাহিত করতে বলেছে। তবে ব্যাংকারদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক এক বৈঠকে তাদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে বলা হয়েছে।
ব্যাংকাররা জানান, ৫ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পাঠানো একটি চিঠির ভিত্তিতে এই নির্দেশনা আসে। এর প্রায় এক সপ্তাহ পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিষয়টি জোর দিয়ে তোলা হয়।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কাজ করতে বলা হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করা এনজিওগুলোকে অর্থ দেওয়ার জন্যও ব্যাংকগুলোকে অনুরোধ করা হয়েছে। এ কাজে এবিবি সহায়তা করবে বলেও জানান তিনি।
মাসরুর আরেফিন এই উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নিলেও অনেক জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বৈঠকে উপস্থিত একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সিইও বলেন, বিষয়টি রাজনৈতিক হওয়ায় আনুষ্ঠানিক ফোরামে না তুলে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করা যেত। গণভোটের ‘হ্যাঁ/না’ প্রশ্নে বিভিন্ন স্বার্থের সংঘাত থাকতে পারে।
আরেক ব্যাংকের সিইও বলেন, আদর্শগতভাবে ব্যাংকগুলোর এ ধরনের বিষয়ে জড়ানো উচিত নয়। সরকার চাইলে একাই এই প্রচার চালাতে পারে। এক সাবেক ব্যাংক এমডি বলেন, এটি ব্যাংকের কাজ নয়। তবে সরকার কিছু চাইলে ব্যাংকগুলোর না করার উপায় থাকে না। অন্যদিকে চতুর্থ একটি ব্যাংকের সিইও দাবি করেন, ব্যাংকগুলোকে ‘বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ’ করা হয়েছে। কোনো জোর করা হয়নি। তবু রাজনৈতিক ইস্যুতে জড়ানো নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
এই বিতর্ক সামনে এসেছে এমন সময়ে, যখন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২’ সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে ব্যাংকিং খাতের অবনতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন।
সমালোচকদের মতে, এই চর্চা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার নামে ব্যাংকগুলোকে সরকারি উদ্যোগ বা রাজনৈতিক প্রচারে বাধ্য করার অভিযোগ ছিল।
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই নির্দেশনাকে ‘গণভোটের স্বচ্ছতার লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, সরকার এখানে পক্ষ নিতে পারে না। এটি জনগণের পছন্দের বিষয়। পক্ষ নেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র জবরদস্তি করছে। তিনি একে ‘হাসিনা পদ্ধতি’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং বলেন, এতে আমলাতন্ত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, সরকারের অনুরোধ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক অন্য ব্যাংকগুলোকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার চালাতে বলেছে।

