ব্যাংক খাতের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক সিদ্ধান্তে একীভূতকরণের পথে থাকা পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা বড় ধরনের আর্থিক ধাক্কার মুখে পড়ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই পাঁচ ব্যাংকে রাখা আমানতের ওপর ২০২৪ ও ২০২৫—এই দুই বছরের কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না। অর্থাৎ, আমানতকারীদের প্রাপ্য মুনাফার একটি অংশ সরাসরি কেটে নেওয়া হচ্ছে, যাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘হেয়ারকাট’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) এ বিষয়ে পাঁচটি ব্যাংকের প্রশাসকের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে সব আমানত হিসাব নতুন করে গণনা করে চূড়ান্ত স্থিতি নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক রীতির কথা বলে মুনাফা কাটা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ব্যাংক একীভূতকরণের সময় আমানতের ওপর নির্দিষ্ট সময়ের মুনাফা বাদ দেওয়ার নজির রয়েছে। সেই আন্তর্জাতিক রীতির আলোকে বাংলাদেশেও এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ব্যাংক রেজুলেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, চলমান ‘ব্যাংক রেজুলেশন স্কিম’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই আমানতের স্থিতি পুনর্গণনা করা হচ্ছে। এর আওতায় ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময়ের জন্য কোনো মুনাফা গণনা করা হবে না। নির্ধারিত হেয়ারকাট প্রয়োগ করে নতুন করে আমানতের চূড়ান্ত হিসাব নির্ধারণ করা হবে।
যেসব ব্যাংক একীভূত হচ্ছে
যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হচ্ছে, সেগুলো হলো—
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।
এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে ইতোমধ্যে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে একটি নতুন ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শেষ হলে ধীরে ধীরে পুরোনো পাঁচটি ব্যাংক বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাদের সম্পদ, দায় এবং জনবল নতুন ব্যাংকের অধীনে চলে যাবে।
আমানতকারীদের মুনাফা বাদ দিয়েই হবে হিসাব
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য কোনো মুনাফা পাবেন না। দুই বছরের মুনাফা বাদ দিয়েই আমানতের নতুন স্থিতি নির্ধারণ করা হবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যক্তি আমানতকারী ছাড়াও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীরাও সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়বেন।
নতুন ব্যাংকের মূলধন কাঠামো
বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত রেজুলেশন স্কিম অনুযায়ী, নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের
অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা।
এর মধ্যে পরিশোধিত মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
এরই মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করেছে, যা ‘ক’ শ্রেণির শেয়ার হিসেবে গণ্য হবে।
এ ছাড়া,
– পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী আমানতের অংশ থেকে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা শেয়ারে রূপান্তর করা হবে (‘খ’ শ্রেণি)।
– অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের স্থায়ী আমানত থেকেও সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা শেয়ারে রূপান্তর হবে (‘গ’ শ্রেণি)।
আমানত তোলার সীমা নির্ধারণ
স্কিম অনুযায়ী, একীভূতকরণ কার্যকর হওয়ার পর
– ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত যে কোনো সময় তোলা যাবে।
– ২ লাখ টাকার বেশি আমানতের ক্ষেত্রে প্রতি তিন মাস পরপর সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা উত্তোলন করা যাবে।
– এই উত্তোলন সীমা সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
মেয়াদি ও স্থায়ী আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা নেওয়া যাবে। বিভিন্ন মেয়াদের স্থায়ী আমানত নির্ধারিত সময় অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন বা দীর্ঘমেয়াদে রূপান্তর হবে। চার বছরের বেশি মেয়াদি আমানত মেয়াদ পূর্তির পর পরিশোধযোগ্য হবে।
নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় নির্ধারণ করা হয়েছে ঢাকার মতিঝিলের সেনাকল্যাণ ভবনে।

