বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন গভীর নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত ‘রেজোলিউশন স্কিম’ ঘিরে এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কার্যত এস আলম গ্রুপকেন্দ্রিক ব্যাংক লুটের দায় গিয়ে পড়ছে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর।
নতুন এই ব্যবস্থায় দুই বছরের মুনাফা বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে আমানতের ওপর সরাসরি হেয়ারকাট আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে আমানতকারীরা সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বিষয়টি শুধু আর্থিক নয়, নীতিগত ও নৈতিক দিক থেকেও বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক লুটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে আমানতকারীদের ওপর দায় চাপানো ন্যায়সংগত নয়। এতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও দুর্বল হবে। সাধারণ মানুষের সঞ্চয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত ঘিরে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। চুরির দায় কেন ভুক্তভোগীর ঘাড়ে চাপানো হবে। নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জবাবদিহিতা নিয়েও আলোচনা জোরালো হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের এই পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রেজোলিউশন স্কিমের চিত্র: পরিকল্পনা বনাম বাস্তব প্রভাব
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত রেজোলিউশন স্কিমের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নোটিশে বলা হয়েছে, স্কিমটির ‘অভিন্ন ও সুষ্ঠু বাস্তবায়ন’ নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই লক্ষ্যেই ব্যাংকগুলোকে দ্রুত সময়ের মধ্যে আমানত হিসাব পুনর্গণনা সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে বাস্তবে এই ‘সুষ্ঠু বাস্তবায়ন’ সবচেয়ে বেশি অসুষ্ঠু হয়ে উঠেছে সাধারণ আমানতকারীদের জন্য। যারা কোনো দিন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন না। যারা ঋণ গ্রহণ বা অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। এমনকি কোনো ধরনের অনিয়মের সঙ্গেও যাদের সংশ্লিষ্টতা নেই। তারাই এখন সরাসরি আর্থিক শাস্তির মুখে পড়ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত আমানত হিসাব পুনর্গণনা করা হবে বিদ্যমান স্থিতির ভিত্তিতে। একই সঙ্গে ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময়ের জন্য আমানতের ওপর কোনো মুনাফা গণনা করা হবে না। এই সময়ের মুনাফা পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে।
এর বাইরে হেয়ারকাট আরোপের ফলে আমানতকারীদের চূড়ান্ত স্থিতি আরও কমে যাবে। অর্থাৎ, যাঁরা ব্যাংকের ওপর আস্থা রেখে কষ্টার্জিত অর্থ জমা রেখেছিলেন, তাঁদের সেই অর্থের একটি বড় অংশ কার্যত হারাতে হবে। কোনো দায় বা অপরাধ ছাড়াই সাধারণ মানুষকে এই ক্ষতি মেনে নিতে হচ্ছে। এই বাস্তবতা রেজোলিউশন স্কিমের উদ্দেশ্য ও প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। নোটিশে ‘সুষ্ঠু বাস্তবায়ন’-এর কথা বলা হলেও বাস্তবে তার ভার সবচেয়ে বেশি বহন করছেন নিরপরাধ আমানতকারীরাই।
এস আলম গ্রুপ ও নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতার উত্তরাধিকার
গত কয়েক বছরে এস আলম গ্রুপকে ঘিরে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে ব্যাংক দখল, পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ, বিপুল অঙ্কের অনিয়মিত ঋণ গ্রহণ এবং অর্থ পাচার। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ ১৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংকঋণের নামে মোট সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা বের করে নিয়েছে।
এই তালিকায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের নাম। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৯৮ শতাংশই খেলাপি অবস্থায় পৌঁছায়। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়জুড়ে এই ব্যাংক লুটের সুযোগ প্রায় পুরোপুরি ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই সময়ে এক্সিম ব্যাংক থেকেও নজরুল ইসলাম মজুমদারসহ কয়েকজন ব্যক্তি বিপুল অঙ্কের অর্থ বের করে নেওয়ার অভিযোগে আলোচনায় আসেন। এসব ঘটনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা নিজেদের জমা অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে নতুন একটি প্রতিষ্ঠানের গঠন করেছে। নতুন এই ব্যাংকের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রক ভূমিকা নিয়ে। ব্যাংক দখল, ফিট অ্যান্ড প্রপার টেস্টে ঘাটতি, ঋণসীমা লঙ্ঘন এবং একই গ্রুপকে বারবার ঋণ অনুমোদনের ঘটনা সবই ঘটেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকির মধ্যেই। তবু কার্যকর হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আজ সেই নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতার ফল ভোগ করছে ব্যাংকিং খাত। ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর সেই দুর্বলতা সামাল দিতে গিয়ে ক্ষতির বোঝা চাপানো হচ্ছে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর, যারা এই অনিয়মের সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত ছিলেন না।
২ বছরের মুনাফা বাতিল: চুক্তি ভঙ্গ
ব্যাংকে আমানত রাখা মানে একটি স্পষ্ট চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া। লিখিত ও অলিখিত উভয়ভাবেই এই চুক্তির মূল কথা একটাই। নির্দিষ্ট সময় শেষে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা বা সুদ পাওয়া যাবে। কিন্তু রেজোলিউশন স্কিমের আওতায় দুই বছরের মুনাফা বাতিলের সিদ্ধান্তে সেই চুক্তি কার্যত ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা এই সিদ্ধান্তকে ‘পশ্চাৎমুখী’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, এটি আমানতকারীর অধিকারকে স্বীকার করে না। আগে করা চুক্তির শর্ত পরিবর্তন করে পরে তা কার্যকর করা নীতিগতভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নির্ভরশীল শ্রেণির ওপর। অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, প্রবাসীর পরিবার এবং ছোট ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে আমানতের মুনাফার ওপর জীবনযাপন করে আসছেন। হঠাৎ করে দুই বছরের আয় বাতিল হওয়ায় তাঁদের আর্থিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে।
একটি উদাহরণ বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে। এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা চাকরি শেষে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ৫০ লাখ টাকা আমানত রাখেন। সেই আমানত থেকে তিনি বছরে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা মুনাফা পেতেন। এই আয় দিয়েই চলত তাঁর সংসার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হেয়ারকাট কার্যকর হলে তাঁর প্রায় ১৬ লাখ টাকার মুনাফা কেটে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে মূলধন কমে নেমে আসবে প্রায় ৩৪ লাখ টাকায়।
এই ক্ষতি শুধু সংখ্যার হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সরাসরি একজন মানুষের জীবনযাত্রায় আঘাত করছে। নিয়ম মেনে ব্যাংকে আস্থা রেখে অর্থ রাখার পরও এমন সিদ্ধান্তে আমানতকারীরা নিজেদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়ছেন।
হেয়ারকাটের বোঝা কার কাঁধে?
ব্যাংকিং খাতে হেয়ারকাট বলতে আমানতের একটি অংশ স্থায়ীভাবে কেটে নেওয়াকে বোঝায়। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এই পদ্ধতি খুবই বিরল। সাধারণত বড় বিনিয়োগকারী বা ঝুঁকিপূর্ণ অংশীদারদের ক্ষেত্রেই হেয়ারকাট প্রয়োগ করা হয়। সাধারণ আমানতকারীরা এই ঝুঁকির বাইরে থাকেন।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় চিত্র ভিন্ন। এখানে হেয়ারকাটের বোঝা চাপানো হচ্ছে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর। তাঁরা কোনো ঝুঁকি নেননি। ব্যাংকের পরিচালনায় ছিলেন না। ঋণ সিদ্ধান্ত বা অনিয়মের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন না। তবু ক্ষতির দায় এসে পড়ছে তাঁদের কাঁধেই।
এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে দায়বদ্ধতা নিয়ে। যারা হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত না করে কেন ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে আমানতকারীদের অর্থ দিয়ে। আদালতের মাধ্যমে এস আলম গ্রুপের সম্পদ জব্দের তথ্য সামনে এলেও সেই সম্পদ কেন বিক্রি করে ব্যাংকের দায় শোধ করা হয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্র চাইলে জব্দ করা সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক ঘাটতি পূরণ করতে পারত। প্রয়োজনে রাষ্ট্র নিজেই সেই সম্পদ ক্রয় করে দায় শোধের ব্যবস্থা নিতে পারত। সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে এই ক্ষতির মুখে পড়তে হতো না। এই প্রেক্ষাপটে হেয়ারকাট নীতি কার জন্য এবং কাদের স্বার্থে—তা নিয়েই এখন সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায় এড়ানোর কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, পুরো প্রক্রিয়াতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যাংক দখলের সময় কার্যকর হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি। অনিয়মিত ঋণ যখন দ্রুত ফুলে-ফেঁপে উঠছিল, তখনও কঠোর নজরদারি ছিল না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি বলেই অভিযোগ রয়েছে। অথচ এখন ক্ষতি বাস্তবে রূপ নেওয়ার পর দায় স্বীকারের বদলে সেই বোঝা চাপানো হচ্ছে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর। এটিকে অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন।
এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্যও উদ্বেগজনক বার্তা দিচ্ছে। বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে বার্তাটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে—আজ লুটপাট হলে কাল তার দায় বহন করবে সাধারণ মানুষ। এতে ব্যাংকিং খাতে নৈতিক ঝুঁকি আরও বাড়বে। এমন দৃষ্টান্ত স্থায়ী হলে ভবিষ্যতে যেকোনো ব্যাংক কেলেঙ্কারির ক্ষতির দায় শেষ পর্যন্ত আমানতকারীদের ওপরই এসে পড়তে পারে।
এর প্রভাব পড়ছে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল ভিত্তি আস্থার ওপর। ব্যাংকিং ব্যবস্থা টিকে থাকে মানুষের বিশ্বাসের জোরে। কিন্তু দুই বছরের মুনাফা বাতিল এবং হেয়ারকাট সেই বিশ্বাসে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। অনেক আমানতকারী এখন আতঙ্কে আছেন। আজ একটি ব্যাংক আক্রান্ত হলে কাল অন্য ব্যাংকের কী হবে, সেই প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে এই সিদ্ধান্ত আস্থার সংকট আরও গভীর করেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু কয়েকটি ব্যাংকে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় এই অনাস্থা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরপরাধের ওপর চাপানো হচ্ছে দণ্ড
এস আলম গ্রুপকেন্দ্রিক ব্যাংক লুটের পেছনে দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতার ছাপ রয়েছে কিন্তু সেই ব্যর্থতার দায় যদি শেষ পর্যন্ত সাধারণ আমানতকারীর কাঁধে চাপানো হয়, তা কোনো সংস্কার নয়। বরং এটি রাষ্ট্রীয় বৈধতা দেওয়া অবিচারের সমতুল্য। প্রকৃত সংস্কারের মানে হলো লুট হওয়া টাকা পুনরুদ্ধার করা, দায়ীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া এবং আমানতকারীর সম্পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এসব না হলে ‘রেজোলিউশন স্কিম’ শুধু ব্যাংক সংস্কারের প্রতীক নয়, আস্থাহীনতার প্রতীক হিসেবেই চিহ্নিত হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের এই সঙ্কট কেবল অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকও বটে। দুই বছরের মুনাফা বাতিল এবং হেয়ারকাটের মতো সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমছে। সরকারের উচিত এই ক্ষতির দায় প্রকৃত অপরাধীদের ওপর চাপানো এবং সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা। তা না হলে ‘রেজোলিউশন স্কিম’ স্বাভাবিক ব্যাংক সংস্কারের পরিবর্তে আস্থাহীনতার প্রতীক হয়ে থাকবে।
শরিয়াহ নীতি অনুযায়ী ৫ ব্যাংকের আমানতকারীরা ২ বছর মুনাফা পাবেন না : গভর্নর
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, শরিয়াহ নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত পাঁচটি একীভূত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা পরবর্তী দুই বছর (২০২৪ ও ২০২৫) কোনো মুনাফা পাবেন না। তিনি এ তথ্য বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানান।
ড. মনসুর বলেন, শরিয়াহ ব্যাংকিংয়ে মূল নীতি হলো, ব্যাংক শুধুমাত্র লাভ করলে তবেই আমানতকারীদের সঙ্গে মুনাফা ভাগ করা যায়। কোনো ব্যাংক লোকসানে গেলে সেই সময়ে মুনাফা বিতরণ করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “শরিয়াহ উইংয়ের গাইডলাইন অনুযায়ী লোকসান হলে আমানতকারীদের জন্য কোনো মুনাফা প্রযোজ্য নয়।”
তিনি আরও জানান, পাঁচটি ব্যাংক ২০২৩ সাল পর্যন্ত আমানতকারীদের মুনাফা দিয়েছে। তবে নতুন অডিটে দেখা গেছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো ব্যাপক লোকসানে পড়েছে। তাই এই দুই বছরের জন্য কোনো মুনাফা বিতরণের সুযোগ নেই।
গভর্নর জানান, নতুন ও পুরনো উভয় ধরনের আমানতকারী ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মুনাফা পেতে শুরু করবেন। তবে এটি নির্ভর করবে নতুন একীভূত ব্যাংক ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’-এর বিনিয়োগ এবং আমানত নীতিমালার ওপর। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি উল্লেখ করেন, “ব্যাংকগুলোর এই সঙ্কটের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দোষীদের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হবে।”
গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি সঙ্কটাপন্ন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত ও একীভূতকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য আমানতের মুনাফায় ‘হেয়ারকাট’ আরোপ করা হবে। অর্থাৎ এই দুই বছরের জন্য আমানতকারীরা কোনো মুনাফা পাবেন না এবং হিসাব অনুযায়ী তাদের ব্যালান্স পুনর্গণনা করা হবে।
একীভূতকরণের আওতায় থাকা ব্যাংকগুলো হলো:
- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক
- গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক
- ইউনিয়ন ব্যাংক
- এক্সিম ব্যাংক
- সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক
গ্রাহক উদ্বেগ ও ব্যাংকে অস্থিরতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই বছরের মুনাফা বাতিলের সিদ্ধান্তের পর গতকাল পাঁচটি ব্যাংকে অস্থিরতা বিরাজ করেছে। গ্রাহকরা শাখায় এসে সরাসরি জানতে চাইছিলেন, কেন তাদের মুনাফা প্রদান বন্ধ করা হয়েছে।
ইউনিয়ন ব্যাংকের একজন গ্রাহক অভিযোগ করেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারির সামনেই এস আলম গ্রুপ ৯৮ শতাংশ টাকা লুট করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ বিষয়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি, বরং নীতিগত সহায়তা দিয়েছে। এখন কেন আমাদের আমানত থেকে টাকা কর্তন করা হবে?”
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা কর্তৃপক্ষের চাপে আত্মীয়পরিজনের টাকা আমানত হিসেবে রাখার জন্য উৎসাহিত করেছি। অনেকেই জীবনশেষের সময় এককালীন পেনশন বা সঞ্চয়ের অর্থ আমানত করেছিলেন। হঠাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে এই পরিবারগুলো চিন্তায় পড়েছে। আমাদের বেতনও ঠিকমতো পাচ্ছি না, তবু গ্রাহক ও পরিবারিক চাপে আমরা দোষারোপের মুখে রয়েছি।” অনুরূপ পরিস্থিতি অন্য ব্যাংকগুলোতেও দেখা গেছে। গ্রাহকরা নিজের আমানতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন, আর ব্যাংক কর্মকর্তারা চাপের মুখে দিন কাটাচ্ছেন।

